• ২০ আশ্বিন১৪২৯  - বুধবার, অক্টোবর ৫, ২০২২

বেহেশতি যুবকদের সরদার হোসাইন রা.

বেহেশতি যুবকদের সরদার হোসাইন রা.

৮ জানুয়ারি ৬২৬ ইং হজরত হোসাইন (রা.) এ ধরাপৃষ্ঠে শুভাগমন করেন। তার জন্মের শুভ সংবাদে রাসূলে করিম (সা.) খুবই আনন্দিত হয়েছিলেন। তিনি নিজেই কানে আজান দেন এবং নবজাতকের নাম হোসাইন রাখেন।

হজরত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর চেহারা ছিল খুবই আকর্ষণীয় ও সুন্দর। হুজুর (সা.)-এর পবিত্র চেহারা মোবারকের সঙ্গে তার চেহারার মিল ছিল। জন্মের সাত দিনের দিন নানা মুহাম্মাদ (সা.)-এর একটি মেষ (কোনো কোনো বর্ণনায় দুটো) জবেহ করে তার আকিকা দেন।

রাসূলে করিম (সা.) বলেন, ‘হাসান এবং হোসাইন বেহেশতে যুবকদের সরদার। (তিরমিজি)। অন্য বর্ণনায় এসেছে এরা দুজন আমার বংশ এবং আমার কন্যার সন্তান, হে আল্লাহ্! আমি তাদের ভালোবাসি, আপনিও তাদের ভালোবাসুন, আর তাদেরও ভালোবাসুন, যারা এদের দুজনকে ভালবাসে।’ (তিরমিজি)। হজরত হোজাইফা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘হুজুর (সা.) বলেছেন, ‘হে হোজাইফা! এই মাত্র হজরত জিবরাইল (আ.) এসে আমাকে সুসংবাদ দিয়ে গেলেন, হাসান-হোসাইন হবে বেহেশতে যুবকদের সরদার (আহমদ)।’

একদিন নবি করিম (সা.) খুতবা দিচ্ছিলেন। সেখানে হজরত হাসান ও হজরত হোসাইন (রা.) উপস্থিত হলেন। তাদের পরনে ছিল লাল পোশাক। তারা একবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন আবার উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটছিলেন। তিনি খুতবার জায়গা থেকে নেমে এলেন এবং তাদের সামনে নিয়ে রাখলেন। এবং বললেন, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ সত্য কথাই বলেছেন, ‘তোমাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ।’ (সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১৫)। আমি দুবালককে দেখার পর আর অপেক্ষা করতে পারিনি। এরপর তিনি আবার খুতবা দিতে শুরু করলেন (মুসনাদ আহমদ)।’

হজরত ই’য়ালা আল-‘আমিরি (রা.) বলেন, তিনি একদিন রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে দাওয়াতে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে দেখলেন হজরত হোসাইন (রা.) কিছু ছেলের সঙ্গে খেলছেন। তিনি তাকে সঙ্গে নিতে চাইলেন। কিন্তু শিশু হোসাইন একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে ছোটাছুটি করতে থাকলেন। আল্লাহ নবি ও যে পর্যন্ত তাকে কবজা করতে না পারলেন, সে পর্যন্ত তার সঙ্গে ছোটাছুটি করতে থাকলেন। হাসান তার ছোট্ট একহাত নবিজির ঘাড় মোবারকের নিচে রাখলেন। আর নবিজি তার মুখের ওপর মুখ রেখে চুমু খেতে বললেন, ‘হোসাইন আমার থেকে আর আমি হোসাইন থেকে। যে হোসাইনকে ভালোবাসে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। সে আমার দৌহিত্রের মধ্যে একজন। যে আমাকে ভালোবাসে, সে যেন হোসাইনকে ভালোবাসে (তারিখ বিন আসাকির)।’

হজরত আবুবকর সিদ্দিক (রা.), হজরত হাসান (রা.) ও হজরত হোসাইন (রা.)কে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, ‘হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর পরিবারের সদস্যদের সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করো।’ তিনি আরও বলতেন, ‘সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার প্রাণ, আমার কাছে আমার নিজের আত্মীয়ের চেয়ে হজরত রাসূলে করিম (সা.)-এর আত্মীয়রা বেশি প্রিয়।’

হজরত উমর বিন খাত্তাব (রা.), হজরত হোসাইন (রা.) ও তার ভাইকে খুবই সম্মানের চোখে দেখতেন। তাদের যথাযথ মর্যাদা দিতেন। তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে চলতেন। হজরত উমর (রা.) বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠার পর হজরত হাসান (রা.) ও হজরত হোসাইন (রা.)সহ বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেককে পাঁচ হাজার দিরহাম করে ভাতার ব্যবস্থা করেন।

হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। তার দানশীলতা ছিল প্রশংসাযোগ্য। তিনি কারও অনুরোধ উপেক্ষা করতেন না। দরিদ্রতার ভয়ে দান করা থেকে তিনি বিরত থাকতেন না। এতে অবশ্য আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ তার নানাজান হজরত রাসূলে করিম (সা.) দয়ালু মানুষদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তার দানশীলতা ছিল বাতাসের প্রবাহের মতো।

হজরত ইমাম হোসাইন বিন আলী (রা.)-এর দুয়ার থেকে কেউ কোনোদিন খালি হাতে ফিরে যায়নি। এমনকি কবিদেরও তিনি বিমুখ করতেন না। কবিদের দান করার ব্যাপারে একবার হজরত হাসান (রা.) তাকে আপত্তি জানালে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বলেন, ‘সেই অর্থই সর্বোত্তম, যা একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে (তাহজিবুল কামাল)।’

হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বলতেন, ‘হে আল্লাহ্! জীবনের প্রতিটি দুঃখ-দুর্দশায় আমি আপনার ওপরই নির্ভর করি। প্রতিটি বিপদেই আমি আপনার ওপর ভরসা করি। আমি যে অবস্থায়ই থাকি না কেন, সর্বাবস্থায়ই আপনি হচ্ছেন নির্ভরতার স্থল, আমার অর্জিত সব নিয়ামত আপনারই দান এবং আপনিই এসব কল্যাণের উৎস।’

হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। দৃঢ় মনোবলের অধিকারী। অকুতোভয় সৈনিক। জিহাদের ডাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সাড়া দিতে কখনো পিছপা হতেন না তিনি। হজরত সাঈদ বিন উমর (রা.) এর বরাতে বলা হয়েছে-তিনি বলেন, একদা হজরত হাসান (রা.) হজরত হোসাইন (রা.)কে বলেন, ‘আমি যদি আপনার মতো দৃঢ় মনোবলের অধিকারী হতে পারতাম।’ আর হজরত হোসাইন (রা.) হজরত হাসান (রা.)কে বলেন, ‘আমি যদি আপনার মতো চমৎকার ভাষাশৈলীর অধিকারী হতে পারতাম!’ (সিয়ার আলম আন নুবালা)।

তাকে একবার হজরত মুয়াবিয়া (রা.)-এর কাছে দূত হিসাবে পাঠানো হয়েছিল। তিনি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কনস্টান্টিনোপলে (ইস্তাম্বুল অভিযানের) যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। সে যুদ্ধে সেনাপতি ছিলেন ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া। এতে হজরত হোসাইন (রা.)-এর মহত্ত্বই প্রকাশ পায়। হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) ইরাকের কুফায় যেতে মনস্থ করলে আমরা তাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেই। তিনি হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে উল্লেখ করেন, আমি রাসূলকে বলতে শুনেছি, ব্যবিলনের ভূমিতে হোসাইন নিহত হবে।’ এ কথা শুনে হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) বলেন, ‘তাহলে আমার পক্ষে মৃত্যু থেকে পালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই (তারিখ ইবনে আসাকির)।’

পবিত্রনগরী যাতে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায়, সে জন্যই তিনি মক্কা ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। হজরত ইবনে যুবায়ের (রা.) তাকে বললেন, ‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন? এমন লোকদের কাছে কী আপনি যাচ্ছেন, যারা আপনার পিতাকে হত্যা করেছে, ভাইয়ের বিরুদ্ধে দিয়েছে অপবাদ?’ তিনি জবাবে বললেন, ‘পবিত্র মক্কানগরীতে রক্তপাত হওয়ার চেয়ে আমার মৃত্যু অধিক শ্রেয় (আল বিদায়া আন নিহায়ায় ইবনে কাসিরের বর্ণনা)।’

হজরত মুয়াবিয়া (রা.) বলেন, ‘আবু আবদুল্লাহ্ (ইমাম হোসাইন) সম্পর্কে আমরা যা জানি, তা হচ্ছে তিনি ছিলেন সিংহের মতো সাহসী; যা সত্য বলে তিনি বিশ্বাস করতেন তা আঁকড়ে ধরতে তিনি কখনো পিছপা হতেন না। যদিও এতে তার মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকত। বস্তুত তার জীবনে তাই সত্য হয়েছিল।

তিনি ছিলেন পরম বাগ্মী ও শিল্পিত মানুষ। তিনি যখন কথা বলতেন তা যেন কথা নয়, যেন তার মুখ থেকে ঝরে পড়ছে মুক্তার দানা। তার বক্তৃতা শ্রোতার মনকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত, তাদের হৃদয়কে করে রাখত আচ্ছন্ন।

হজরত ইমাম হোসাইন বিন আলী (রা.) ৬১ হিজরির ১০ মহররম পবিত্র আশুরার দিনে ইরাকের কারবালা প্রান্তরে শাহাদতবরণ করেন।


অন্যান্য
ভ্রমন