• ১৫ অগ্রহায়ণ১৪২৯  - মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৯, ২০২২

অব্যাহত থাকুক পুণ্যযাত্রা

অব্যাহত থাকুক পুণ্যযাত্রা

আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অপার কৃপায় দুবছর পর খোলা মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরে তার দরবারে হাজারও শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। তিনি আমাদের পবিত্র মাহে রমজানের দিনগুলো সুস্থতার সঙ্গে কাটানোর তৌফিক দিয়েছেন, আলহামদুলিল্লাহ। এখন আমাদের কর্তব্য রমজানের ইবাদতগুলোকে বছরজুড়ে জারি রাখা। আমরা যদি রমজানের দিনগুলোর মতো সারা বছরই ইবাদত-বন্দেগি ও দান-খয়রাতের প্রতি মনোযোগী হই তাহলে আমরা আল্লাহপাকের প্রিয়ভাজন হতে পারব।

রমজানের দিনগুলোতে যেভাবে আমরা ফরজ ও নফল ইবাদত এবং সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি ও দয়ার আচরণ করেছি ঠিক একইভাবে রমজানের পরও তা বহমান রাখতে হবে। আমরা যদি সারা বছরই রমজানের মতো উত্তম কাজ করতে থাকি তাহলে তা হবে আমাদের নিজেদের জন্যই কল্যাণকর আর সারা বছর আমরা আল্লাহপাকের সন্তুষ্টির চাদরে আবৃত থাকব। যেভাবে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আমলে সালেহ করে তা তার নিজের জন্যই’ (সূরা জাসিয়া, আয়াত : ১৫)। এ আমলে সালেহ বা উত্তম কাজ বলতে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমষ্টিগত জীবনে সর্বস্তরের ছোট-বড় সব ধরনের কল্যাণকর কাজকেই বোঝানো হয়েছে।

এখানে সমাজকল্যাণমূলক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পারিবারিক ইত্যাদি সব রকমের কাজই ইসলামের অনুশাসন অনুযায়ী হলে তা-ই আমলে সালেহ বা উত্তম কাজ হিসাবে পরিগণিত হয়। আর এসব কাজের মাধ্যমেই প্রকৃত ইমানের পরিচয় ও প্রমাণ পাওয়া যায়। তাই আমরা যদি রমজানের পূর্ণ কর্মগুলোকে নিজেদের জীবনের সঙ্গী বানিয়ে নিই তাহলে আমাদের জীবন হবে শান্তিময় এবং আল্লাহ পাক আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকবেন।

সাধারণত দেখা যায়, যারা সারা বছর ইবাদত-বন্দেগিতে যতটা আগ্রহী না তারাও এ রমজান মাসে ইবাদতের প্রতি বিশেষ মনোযোগী হয়। যারা কোনো দিন মসজিদমুখী হয় না তারাও রমজান মাসে মসজিদে কমপক্ষে দৈনিক একবার হলেও জামাতে নামাজ আদায় করেন। এ ছাড়া এ দিনগুলোতে প্রতিটি মসজিদ মুসল্লিদের দ্বারা থাকে ভরপুর। মসজিদগুলো হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত। কিন্তু যেদিন থেকেই রমজান শেষ হয় সে দিন থেকেই মসজিদের মুসল্লি কমতে থাকে। যে যুবকরা নিয়মিত মসজিদে এসে নামাজ আদায় করত তাদের আর চোখে পড়ে না, যারা গরিবদের মুখে খাবার ও বস্ত্র তুলে দিত তারাও যেন কোথায় হারিয়ে যায়। এসব দান-খয়রাত আর ইবাদত-বন্দেগি কি শুধু রমজান মাসের জন্যই সীমাবদ্ধ? প্রকৃত মোমেন তারাই যারা সারা বছরই আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকে।

আল্লাহপাক এটাই চান, তার বান্দারা যেন সব সময় সৎ কাজ করে আর তাদের কীভাবে ক্ষমা ও দয়ার চাদরে আবৃত করা যায়। যেমন হাদিসে উল্লেখ আছে, হজরত আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত নবি করিম (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন, যে ব্যক্তি একটি সৎ কাজ করবে, সে এর দশ গুণ অথবা অধিক সওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি একটি অন্যায় করবে, সে তেমনি একটি অন্যায়ের শাস্তি পাবে অথবা আমি মাফ করে দেব। যে ব্যক্তি আমার এক বিঘত নিকটবর্তী হবে, আমি তার এক হাত নিকটবর্তী হব, যে ব্যক্তি আমার এক হাত নিকটবর্তী হবে, আমি তার দুই হাত নিকটবর্তী হব। যে ব্যক্তি হেঁটে হেঁটে আমার কাছে আসবে আমি দৌড়ে তার কাছে যাব। যে ব্যক্তি পৃথিবী সমান গুনাহ নিয়ে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, অথচ সে আমার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করেনি, আমি তার সঙ্গে অনুরূপ পৃথিবীভর্তি ক্ষমা নিয়ে সাক্ষাৎ করব (মুসলিম)। তাই রমজানে যেভাবে আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা লাভ করার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করেছি ঠিক একই প্রেরণা নিয়ে বছরের বাকি দিনগুলোতেও রত থাকতে হবে।

আসলে পবিত্র রমজানের রোজাগুলো প্রকৃত ফলপ্রসূ তখনই হবে যখন আমরা সারাটি বছর রমজানের দিনগুলোর মতো কাটাব। এক মাস রোজা রাখার পর আমার জীবনে যদি আধ্যাত্মিক কোনো পরিবর্তনই না ঘটে তাহলে রোজা রেখে আল্লাহর কাছ থেকে আমি কি লাভ করলাম? এ ছাড়া কেবল মুখে এ দাবি করলেই হবে না, এ রমজান থেকে আমি আমার জীবনকে পরিবর্তন করেছি বরং আমার কৃতকর্মেও পরিবর্তনের বিষয়টি প্রকাশ ঘটাতে হবে। আর আমরা যদি এমনটি করি তাহলে আগামী রমজান পর্যন্ত আমাদের দ্বারা যদি ছোটখাটো কোনো গুনাহ হয়েও যায় তা আল্লাহ ক্ষমা করে দেবেন।

যেভাবে হাদিসে উল্লেখ পাওয়া যায়, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হজরত রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ, এক জুমা থেকে আর এক জুমা এবং এক রমজান থেকে আর এক রমজানের মধ্যবর্তী দিনগুলোর ছোট ছোট গুনাহের কাফফারা হয়, যদি কবিরা গুনাহগুলো পরিহার করা হয় (মুসলিম)। তাই আমাদের রমজানের আমলে সালেহকে ধরে রাখতে হবে তাহলে আল্লাহ পাক আমাদের ছোটখাটো ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেবেন।

আল্লাহতায়ালার ইবাদতের যে আদেশ তা কি কেবল রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট? রমজান চলে যাবে আর ইবাদতের প্রতি গাফেল হয়ে যাব, এ শিক্ষা কি ইসলাম দেয়? বরং ইবাদতের আদেশ হচ্ছে আল্লাহতায়ালার স্থায়ী আদেশ যা কেবল রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। সেই সঙ্গে অসহায়দের সাহায্য করা ও এতিমদের লালন-পালনের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার যে আদেশ তাও তো স্থায়ী আদেশ-এটিও কেবল রমজানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। প্রত্যেক মুসলমানের উচিত হবে রমজানের দিনগুলোর মতো সারাটি বছর অতিবাহিত করা।

আমাদের মাঝে তারাই সৌভাগ্যবান যারা রমজানকে একটি প্রশিক্ষণ মাস হিসাবে গ্রহণ করে সারা বছর এর ওপর আমল করে আল্লাহপাকের জান্নাতের অংশীদার হয়। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রমজানের দিনগুলোর মতো বছরের বাকি ১১ মাস একইভাবে ইবাদত-বন্দেগি করার সৌভাগ্য দান করুন। আমিন।

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট


ভ্রমন