•  জ্যৈষ্ঠ১৪২৯  - সোমবার, মে ২৩, ২০২২

অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে তিন চালিকাশক্তি

অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে তিন চালিকাশক্তি

স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরে দেশের অর্থনীতিতে ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকগুলোতে প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সামনের সারিতে বাংলাদেশ। এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে তিন চালিকাশক্তি। এগুলো হলো-কৃষি, গার্মেন্টস এবং রেমিট্যান্স (প্রবাসী আয়)। মোট বৈদেশিক আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ আসে গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্স থেকে। আর মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষিতে। শুধু অর্থনীতি নয়, দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে খাতগুলো। দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টিহীনতা দূর, শিক্ষা, চিকিৎসা, অবকাঠামো উন্নয়ন, বাল্যবিয়ে রোধ, বিভিন্ন অপরাধ কমানো এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে খাতগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ এই তিন খাতের ওপর ভর করে এগিয়েছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদ এবং সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন খাতকে আরও এগিয়ে নিতে সময়ের সঙ্গে মিল রেখে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশের অর্থনীতিতে তিন খাতের অবদান অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশই পোশাক খাতের। এছাড়া বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা তৈরির ক্ষেত্রেও রেমিট্যান্সের বিশাল অবদান আছে। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান এবং তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ক্ষমতা বাড়িয়েছে এ খাত। অন্যদিকে মোট অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কিছুটা কমলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এ খাতের বিশাল অবদান। তবে এখানে যেসব সম্ভাবনা রয়েছে, তা কাজে লাগাতে পারলে দেশ আরও এগিয়ে যেত। বিশেষ করে তিন খাতে পরিকল্পিত বিনিয়োগ দরকার। আগামীতে দেশের অর্থনীতির জন্য বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে ওমিক্রন কোথায় গিয়ে থামবে আমরা জানি না। এছাড়া বাংলাদেশ ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় চলে এসেছে। ফলে আগামীতে বৈশ্বিক অনেক সুবিধা থাকবে না। আর এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তির ব্যবহার, সুষম বণ্টন এবং সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশের আর্থিক কাঠামো কৃষিভিত্তিক। শস্য, মাঠ এবং প্রাণিসম্পদ-তিন খাতকে কৃষির মধ্যে ধরা হয়। দেশের ৭০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। খাদ্য সরবরাহের প্রধান উৎসই এ খাত। সরকারি তথ্য অনুসারে মোট দেশজ আয়ে (জিডিপি) কৃষির অবদান ১৪ শতাংশ। কিন্তু কর্মসংস্থানের দিক থেকে প্রথম অবস্থানে এ খাত। বর্তমানে প্রায় ৭ কোটি শ্রমশক্তির মধ্যে কৃষিতেই রয়েছে দুই কোটি ৬০ লাখের বেশি। অর্থাৎ মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের বেশি কৃষিতে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদন ছিল এক কোটি ৮ লাখ টন। কিন্তু বর্তমানে তা চার কোটি ৫৪ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। অর্থাৎ কৃষির ওপর নির্ভর করে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ। এছাড়া বিভিন্ন শিল্পে মূল্য সংযোজন করছে এ খাত।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান (ইফপ্রি), বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে-বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্য নিরসনে কৃষি উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইফপ্রির বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচকে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ভালো অবস্থানে আছে। বাংলাদেশ বিশ্বে ধান, পাট, কাঁঠাল, আম, পেয়ারা, আলু, সবজি ও মাছ উৎপাদনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ ১১টি ইলিশ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে প্রথম অবস্থানে। এছাড়া পাট রপ্তানিতে প্রথম ও উৎপাদনে দ্বিতীয়, কাঁঠালে দ্বিতীয়, চাল, মাছ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, আম ও আলুতে সপ্তম, পেয়ারায় অষ্টম এবং মৌসুমি ফলে দশম অবস্থানে বাংলাদেশ। আর কৃষিতে এ অর্জনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো এখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। প্রযুক্তির হাত ধরে গত ১৫ বছরে পোলট্রি, গবাদিপশু এবং মাছ চাষে বিপ্লব হয়েছে। দাম তুলনামূলকভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর মধ্যেও রয়েছে কৃষি। এ খাতে কৃষকের সহায়তা পুঁজির সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে সরকারের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২৮ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে কৃষি ও কৃষিসংশ্লিষ্ট খাতে মোট বাজেটের ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজ বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর পার হয়েছে। প্রথম তিন দশকে কৃষিতে উন্নতি হয়েছে। পরের দশকে অর্থাৎ চল্লিশের দশকে তার দ্বিগুণ হয়েছে। আবার ৪০ থেকে ৫০ বছরে অর্থাৎ শেষ দশকে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হয়েছে। এই পরিবর্তনের কারণ হলো এখানে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, নানা ধরনের চাষাবাদ বেড়েছে, নতুন বীজ আসছে। এ সময়ে বিশ্বব্যাপী কৃষিতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। গবেষণা বেড়েছে, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কৃষি, নানান ধরনের আবিষ্কার হয়েছে। অর্থাৎ তারা স্মার্টকৃষিতে চলে গেছে। সুনির্দিষ্টভাবে একে প্রিসিশন এগ্রিকালচার বলা হয়। কিন্তু আমরা ওই ধরনের কৃষিতে এখনো যেতে পারিনি। সেখানে যেতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, প্রথম ও দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব যখন হয়েছে আমরা টের পাইনি। তৃতীয় বিপ্লবের কিছুটা হাওয়া আমাদের গায়ে লেগেছিল। সেখানে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। ফলে এখানে কৃষিতে জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, কৃষিতে এখন নানা ধরনের মূল্য সংযোজন হচ্ছে। এটিকে বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। স্মার্টকৃষির অবকাঠামো উন্নয়ন, নিয়ম-নীতি তৈরি এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে যেতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেক চালিকাশক্তি পোশাক শিল্প। বর্তমানে বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। সারা পৃথিবীতে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ খ্যাতি দিয়েছে এই পণ্য। শ্রমঘন এ শিল্পটি ৪৪ লাখ মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান করেছে। আর এ খাত থেকে এ বছর রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য ৩৫ বিলিয়ন ডলার, যা দেশে মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ। আশির দশক পর্যন্ত মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ ছিল পাট ও পাটজাত পণ্য। এরপর পাটকে পেছনে ফেলে পোশাক শিল্পের যাত্রা শুরু। ১৯৮২ সালে কারখানার সংখ্যা ছিল ৪৭ এবং ১৯৮৫ সালে ৫৮৭, আর ১৯৯৯ সালে ২ হাজার ৯শ এবং বর্তমানে কারখানা ৫ হাজার ছাড়িয়েছে। ১৯৮৩-৮৪ সালে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৩ দশমিক ৮৯ ভাগ। কিন্তু গত দশ বছরের গড় হিসাবে মোট রপ্তানি আয়ের ৮৩ শতাংশ আসছে এ খাত থেকে। পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ নতুন উদ্যোক্তা দল সৃষ্টি করেছে। যারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে শক্তিশালী বেসরকারি খাত গড়ে তুলেছেন। এ খাতের হাত ধরেই বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ হয়েছে। গার্মেন্টস দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও পরে তারা অন্যান্য শিল্পে রূপান্তর ঘটিয়েছে। আর বর্তমানে রাজস্ব আয়ের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই আসছে বেসরকারি খাত থেকে। অন্যদিকে পোশাক শিল্পের বিকাশে নারীর ক্ষমতায়নসহ বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ছাড়াও তৈরি পোশাক শিল্পে ২৫ লাখের বেশি নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এতে শ্রমজীবী নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন পরিবারে তাদের অবস্থানের পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। আর্থিক সক্ষমতা অর্জনের কারণে এসব নারীর সামাজিক মর্যাদাও বেড়েছে। চাকরির সুবাদে পুরুষের কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ শ্রমজীবী নারী এখন বিয়ে এবং সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী সিদ্ধান্তের কথা বলতে পারেন। তারা পারিবারিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও অংশ নিতে পারছেন। সমাজে বাল্যবিয়ে কমছে, সেই সঙ্গে হ্রাস পেয়েছে জন্মহার। শ্রমজীবী মেয়েরা ভাইবোনদের যত্ন নিচ্ছে এবং স্কুলে পাঠাচ্ছে। ফলে দেশে সাক্ষরতার হার বেড়েছে। তবে সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে এখনো এ শিল্পকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। শ্রমঘন শিল্প হিসাবে পোশাক শিল্পের জন্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি জরুরি। শ্রমিক, ডিজাইনার, মার্চেন্ডাইজার, পণ্য উন্নয়নকারী ও ব্যবস্থাপক প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশে পোশাক শিল্পের জন্যে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার এখনো যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। দেশের স্কুল ও কলেজগুলোর পাঠ্যক্রমে পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট কোনো পাঠ্যসূচি বা অধ্যায় নেই। অর্ধশত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাত্র একটিতে টেক্সটাইলের ওপরে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেক্সটাইল বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর উচ্চশিক্ষা লাভের ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে পোশাক খাতে ডিজাইনারসহ দক্ষ জনবল বিদেশ থেকে আনতে হয়।

অন্যান্য
ভ্রমন