•  জ্যৈষ্ঠ১৪২৯  - সোমবার, মে ২৩, ২০২২

আমরণ অনশন ও ইসলাম

আমরণ অনশন ও ইসলাম

প্রতিটি প্রাণ মহান আল্লাহর সৃষ্টি। তিনিই সব প্রাণের মালিক। মালিক তিনি মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের। তাই আল্লাহর নির্দেশনা ব্যতীত কোনো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করা সঠিক নয়। বৈধ নয় কোনো অঙ্গহানি অথবা জীবন ধ্বংস করা। মানুষ নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও প্রাণের মালিক নিজে নয়। এসব মহান প্রভুর পক্ষ থেকে আমানত। এগুলো নষ্ট করা অথবা কাউকে দেওয়ার অনুমতি নেই। তাই মানুষ নিজেকে নিজে হত্যা করতে পারে না। পারে না আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিতে। ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মহত্যা একটি মহাপাপ। বর্তমান বিশ্বে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের নামে না খেয়ে আমরণ অনশনের প্রথা চালু আছে। পারিবারিক ছোট ছোট বিষয়ে অনেকে অনশন করে থাকে। দাবি আদায়ের উদ্দেশ্যে কিছু না খেয়ে থাকার নাম অনশন। বৈধ বা অবৈধ যে কোনো ধরনের দাবি আদায়ের জন্য আমরণ খাবার ত্যাগ করে প্রাণঘাতী অনশন বা উপবাসের পদ্ধতি অবলম্বন করার অনুমতি ইসলামে নেই। তবে বৈধ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কোনো অঙ্গ বা প্রাণহানি না হওয়ার শর্তে অনশন ধর্মঘটের অনুমতি হতে পারে। প্রাণহানি বা শরীর অস্বাভাবিক ক্ষতির উপক্রম হলে অনশন ভেঙে খাবার গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় খাবার না খেয়ে মারা গেলে তা আত্মহত্যার শামিল হবে। যার শাস্তি হলো জাহান্নাম। অতএব ইহজগতে যত বড় সমস্যার সম্মুখীন হোক না কেন পরকালের বিশ্বাসী কোনো মুসলমান আমরণ অনশনের পথ গ্রহণ করতে পারে না। পারে না আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে। মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেন- ‘তোমরা নিজেদের হত্যা কর না, নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের প্রতি দয়ালু। আর যে সীমালঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে এরূপ করবে তাকে খুব শিগগিরই অগ্নিতে দগ্ধ করব।’ (সুরা নিসা-২৯-৩০)। অপর আয়াতে তিনি বলেন, ‘আর তোমরা নিজেদের ধ্বংসের মধ্যে ফেলো না।’ (সুরা বাকারা-১৯৫)। মহানবী (সা.) আত্মহত্যার কঠিন শাস্তি বর্ণনা করে বলেছেন, ‘আত্মহত্যাকারী নিজেকে যে উপায়ে হত্যা করবে, তাকে ওইভাবে জাহান্নামে শাস্তি প্রদান করা হবে।’ (সহিহ বুখারি)। প্রখ্যাত ইমাম আবু বকর রাজী (রহ.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি খাবার গ্রহণ থেকে বিরত থাকল, ফলে সে মারা গেল- সে আত্মহত্যাকারী। যার কাছে খাবার থাকা সত্ত্বেও না খেয়ে মারা গেল, সে মহাপাপ করেছে।’ (তাফসিরে আহকামুল কোরআন-১/১১৭)। প্রসিদ্ধ ফিকহ বিশারদ ইমাম সারাখসি (রহ.) লিখেন- নিজেকে হত্যা করা যেমন মহাপাপ, তেমনি নিজের হত্যার জন্য সহযোগিতা করাও মহাপাপ। (শরহুস সিয়ারিল কাবির-৪/১৪৯৮)। ইসলামী শরিয়তের বিধান মতে- কোনো ব্যক্তি যদি হালাল খাবার না পাওয়ার কারণে ক্ষুদায় মারা যাওয়ার উপক্রম হয় তাহলে তার জন্য জীবন রক্ষার পরিমাণ অনুযায়ী মৃত প্রাণীর গোশত খেয়ে হলেও প্রাণ বাঁচানো ওয়াজিব। এমতাবস্থায় না খেয়ে মারা গেলে সে গুনাহগার হবে। (আল ফাতাওয়া আল কুবরা ইবনে তাইমিয়া)। একাধারে কয়েকদিন রোজা রাখা এবং গোটা বছর অনবরত রোজা রাখা থেকে রসুলুল্লাহ (সা.) নিষেধ করেছেন। (সহিহ বুখারি, মুসলিম)। ইসলাম ধর্মে মুসাফির, গর্ভবতী ও অসুস্থদের জন্য রোজা স্থগিত করা হয়েছে। (সুরা- বাকারা-১৮৫, তিরমিজি)। সাহরি দেরিতে এবং ইফতার তাড়াতাড়ি করার বিধান দিয়েছে। (সুরা-বাকারা-১৮৭)। মহানবী (সা.) শরীরের যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং অবৈধ করেছেন যাবতীয় ক্ষতিকর জিনিস। এসব বিধান অঙ্গহানি ও প্রাণঘাতী যে কোনো কাজ নিষিদ্ধ প্রমাণ করে। সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজের নিষেধ করা এবং অধিকার রক্ষা করা ইসলামের মৌলিক বিধান। অন্যায়, অবিচার ও অপরাধমূলক কাজে বাধা প্রদান করা প্রকৃত মুসলমানের ইমানি দায়িত্ব, মুমিনের অন্যতম গুণ। এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত আরোপ করা হয়েছে। এর অন্যতম হলো- যারা অন্যায়-অনাচারের প্রতিরোধ ও পরিবর্তন করতে চান তারা অবশ্যই সক্ষম হতে হবে। এ ক্ষেত্রে যেন বড় কোনো ক্ষতি অথবা মারাত্মক বিপর্যয় না হয় তা অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। দেশ, জাতি ও ইসলামের জন্য বিপদের কারণ না হয় তা বুঝতে হবে। ইসলামের সীমারেখা অনুসরণ করে মহান প্রভু আমাদের অধিকার পাওয়ার তৌফিক দিন।

অন্যান্য
ভ্রমন