•  জ্যৈষ্ঠ১৪২৯  - সোমবার, মে ২৩, ২০২২

ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থতার বোঝা জনগণের ঘাড়ে

ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থতার বোঝা জনগণের ঘাড়ে

কর্তৃপক্ষের অনিময়, দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র এবং অদক্ষতার কারণে ঢাকা ওয়াসা ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার পথে। এমনটি মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, এসব কারণে একদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বেশি হচ্ছে, অপরদিকে ঘাটতি মেটাতে দফায় দফায় বাড়ানো হচ্ছে পানির দাম। সংকটের সমাধান চাইলে প্রথমত দুর্নীতির লাগাম টানতেই হবে। এরপর বিদায় দিতে হবে একনায়কতন্ত্র। এ দুটি করা সম্ভব হলে অদক্ষতাসহ বাকি সমস্যাগুলো এমনিতে সমাধান হয়ে যাবে।

জানা যায়, ঢাকা ওয়াসার বর্তমান প্রশাসন বিগত প্রায় ১৩ বছরে পানির দাম বাড়িয়েছে ১৪ বার। কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যেও দুই বছরে দুদফা আবাসিক ও বাণিজ্যিক পানির দাম বাড়াতে ভুল করেনি সংস্থাটি। তবে প্রতিবছর পানির দাম বাড়লেও ঢাকা ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির গুণগত মান বাড়ছে না। সরবরাহ লাইনের পানি সরাসরি খাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কোনো কোনো এলাকার পানি ফুটিয়েও পান করতে পারছেন না নগরবাসী। আরও জানা যায়, এ অবস্থার মধ্যে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে ফের বাড়ানো হচ্ছে পানির দাম। সোমবারের বোর্ড সভায় নতুন করে পানির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বোর্ড সদস্য প্রকৌশলী তাকসিম এ খান। তবে বেশিরভাগ বোর্ড সদস্য এতে বাদ সাধেন। ফলে প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি। এরপরও বোর্ড সদস্যদের ওপর চাপ তৈরি করে তিনি এ প্রস্তাব অনুমোদনের চেষ্টা করছেন।

নতুন দাম কার্যকর হলে রাজধানীবাসীকে ইউনিট প্রতি আবাসিক পানির দাম ১৫ টাকা ১৮ পয়সার স্থলে ২১ টাকা গুনতে হবে। বাণিজ্যিক পানির দাম ৪২ টাকার স্থলে হবে ৫৫ টাকা। এক বোর্ড সদস্য জানান, ‘সরকারের উচ্চপর্যায়ের দোহাই দিয়ে ঢাকা ওয়াসা বোর্ড সদস্যদের এক ধরনের ভয় দেখানো হয়। মূলত এভাবেই ১৪ দফা পানির দাম বাড়ানো হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার বোর্ড চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ড. মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার পক্ষ থেকে নতুন করে পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন আইন-১৯৯৬ অনুযায়ী ঢাকা ওয়াসা বোর্ড প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে পানির দাম বাড়াতে পারবে। কিন্তু ঢাকা ওয়াসা থেকে এবার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, সেটা ৫ শতাংশের বেশি। এ প্রস্তাব অনুমোদন করার ক্ষমতা বোর্ডের নেই।’

তিনি বলেন, ‘সোমবার অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় পানির দাম বাড়ানোর বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বেশিরভাগ সদস্য এর বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন। এরপরও মন্ত্রণালয় চাইলে এটা অনুমোদন করে দিতে পারে। তারপরও মন্ত্রণালয় চায় বোর্ড থেকে একটা প্রস্তাব পাঠানোর জন্য। এজন্য বিষয়টি নিয়ে আমি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলব। এরপর মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক্রমে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চেয়ারম্যান ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার অনিয়ম, দুর্নীতি, একনায়কতন্ত্র এবং অদক্ষতার কারণে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চলেছে। পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন সেবা দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতাগুলো দূর না করে ব্যর্থতার দায় জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের উচিত এ সংস্থার দুর্বলতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার পানির গুণগত মান খুবই নাজুক। না ফুটিয়ে ট্যাপের পানি পান করা যায় না। এরপরও পানির গুণগন মান উন্নয়নে কর্তৃপক্ষের কোনো পদক্ষেপ নেই। মান বাড়ানোর দিকে মনযোগ না দিয়ে পানির দাম বাড়াতে মরিয়া সংস্থাটি। ঢাকা ওয়াসা প্রশাসন এবং ঢাকা ওয়াসা বোর্ডকে পানির গুণগত মানের দিকে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

জানতে চাইলে নগর বিশেষজ্ঞ এবং প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা একটি স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এজন্য তাদের যা কিছু তাই করছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা যথাযথভাবে সম্ভাব্যতা না করেই তা বাস্তবায়ন করছেন। এতে করে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা মিলছে না। মূলত অনিয়ম, দুর্নীতি এবং লুটপাটের মানসিকতা থেকে তারা এগুলো করছেন।

বাস্তবতা হলো, সবাই মিলেমিশেই এসব করছেন। অথচ দেখার যেন কেউ নেই।’ তিনি বলেন, ‘অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট বন্ধ করলে পানির দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন হতো না। প্রকল্পগুলো অনেক কম টাকায় বাস্তবায়ন করা যেত। একইভাবে প্রকল্পগুলো থেকে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা মিলত। কিন্তু সেদিকে কারও কোনো নজর নেই।’ তিনি মনে করেন, ‘ঢাকা ওয়াসাকে স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান থেকে গণমানুষের প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে ব্যর্থ হলে বিদ্যমান সংকট নিরসন করা সম্ভব হবে না। এ বিষয়ে ঢাকাবাসীকে আরও সজাগ হতে হবে। তা না হলে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসবে স্বৈরতান্ত্রিক চক্রটি।’

অন্যান্য
ভ্রমন