•  জ্যৈষ্ঠ১৪২৯  - সোমবার, মে ২৩, ২০২২

হিসাব মেলাতে পারছে না প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স!

হিসাব মেলাতে পারছে না প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স!

নিজস্ব প্রতিবেদক :  প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড সর্বশেষ ২০২০ সালে তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করে। তবে ২০২০ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও লভ্যাংশ ঘোষণা করেনি কোম্পানিটি। এরপর ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিক, দ্বিতীয় প্রান্তিক ও তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনও প্রকাশ করতে পারেনি প্রগ্রেসিভ লাইফ। তাদের হিসাবে রয়েছে গরমিল। অথচ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে হু হু করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কভিডের কারণে কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা যায়নি। এতে বিনিয়োগকারীরা সঠিক সময়ে আর্থিক বিবরণী প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না তারা। এমনকি কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত তারা। অথচ গত এক বছরে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারদর সর্বনিম্ন ৯৪ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৪৭ টাকা ১০ পয়সায় ওঠে।

জানা যায়, জীবন বীমা খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০০০ সালে কার্যক্রম শুরু করে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। আর পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত হয় ২০০৬ সালে। বর্তমানে ২০২০ সালের বার্ষিক হিসাব ও এজিএম করার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সর্বশেষ ‘বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০১৯’-এ দেখা যায়, প্রতি বছর জীবন বীমা থেকে আয় কমছে। ২০১৯ সালে প্রিমিয়াম আয় হয়েছিল ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, এর আগের বছর যা ছিল ৬৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। একইভাবে ২০১৭ সালে ছিল ৭৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা, ২০১৬ সালে ৮০ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ও ২০১৫ সালে ৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রিমিয়াম আয় কমেছে প্রায় ২৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১৯ সালের কোম্পানিটির মোট আয় ছিল ৮৭ কোটি ২৮ লাখ টাকা, আগের বছর যা ছিল ৯০ কোটি ৩০ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আয় কমেছে তিন কোটি দুই লাখ টাকা। ২০১৯ সালের প্রান্তিক হিসাবে দেখা যায়, ৯ মাসে লাইফ ইন্স্যুরেন্স ফান্ডের আকার কমেছে পাঁচ কোটি টাকা। অর্থাৎ ওই বছর তৃতীয় প্রান্তিক শেষে লাইফ ফান্ডে ছিল ২৭১ কোটি ৯৬ লাখ টাকা, ৯ মাস আগে যা ছিল ২৭৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

এছাড়া বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিশোধিত মূলধন আছে মাত্র ১৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে উদ্যোক্তা পরিচালকদের ধারণকৃত শেয়ার আছে ৩৮ দশমিক ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৪ লাখ ৬০ হাজার ৮৭৭টি শেয়ার। অথচ ‘বীমা আইন, ২০১০’ অনুসারে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন থাকার কথা ৩০ কোটি টাকা। আর পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ জোগান দেবেন উদ্যোক্তা পরিচালকরা, কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে উল্টো চিত্র। অর্থাৎ বীমা আইন পরিপালনে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা পরিচালকরা। এ বিষয়ে গত বছর ১৭ জানুয়ারি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এক মাসের মধ্যে নিবন্ধিত লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্সগুলোকে ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণ ও পরিশোধিত মূলধনের ৬০ শতাংশ শেয়ার ধারণ আইন পরিপালনের নির্দেশনা জারি করে।

তখন আইডিআরএ’র পরিচালক জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় ‘বীমা আইন, ২০১০’-এর ২১(৩) ধারা পরিপালনপূর্বক এক মাসের মধ্যে তফসিল-১ অনুযায়ী ন্যূনতম পরিশোধিত মূলধন সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আইডিআরএ’কে অবহিত করতে বলা হয়েছে। আর এ নিদের্শনা বাস্তবায়ন করার জন্য এক মাসের কথা থাকলেও প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেছে। তবে এখন পর্যন্ত প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পরিচালকরা শেয়ার কেনার উদ্যোগ নেননি বা ঘোষণা দেননি। অন্যদিকে বীমা আইন লঙ্ঘন করলেও নীরব ভূমিকায় রয়েছে আইডিআরএ। অথচ অপরাধ ও দণ্ডের বিষয়ে ‘বীমা আইন, ২০১০’-এর ১৩০ ধারায় বলা হয়, ‘এই আইন পরিপালনে ব্যর্থতা কিংবা লঙ্ঘনজনিত কর্মকাণ্ডের জন্য পরিচালক বা ব্যক্তিকে অনধিক ৫ (পাঁচ) লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে এবং এই লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলে প্রতিদিন অতিরিক্ত পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা যাবে।’

বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারী বলেন, বীমা খাতের প্রতিষ্ঠান প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ২০২০ সালের লভ্যাংশ দেয়নি। এছাড়া ২০২১ সালের নিয়মিত প্রান্তিক হিসাব প্রকাশ করছে না। নতুন বছর শুরু হয়েছে। কোম্পানিটি বীমা আইন অনুসরণ ও প্রতিপালন করছে না। আইডিআরএ ও বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন কি এসব অনিয়ম দেখে না? তারা কী করে? একটা কোম্পানির ব্যবসায়িক পরিকল্পনা আমরা বিনিয়োগকারীরা সময়মতো জানতে না পারলে আমরা কি পুঁজি রক্ষা করতে পারব? এসব অনিয়ম চলতে পারে না। কোম্পানিটি সব সময় হিসাব প্রকাশ নিয়ে দেরি করে। অবিলম্বে প্রশাসক নিয়োগ দেয়া উচিত।

এ বিষয়ে প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ জহির উদ্দিন বলেন, কভিডের কারণে ২০২০ সালের আর্থিক প্রতিবেদন সময়মতো প্রকাশ করতে পারিনি। এজন্য আমরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে সময় চেয়েছি। কিন্তু আমরা সময় পাইনি। এর জন্য হাইকোর্টে আপিল করেছি। এ কারণে ২০২০ সালের আর্থিক হিসাব বিবরণী প্রকাশ করতে পারিনি। একই সঙ্গে ২০২১ সালের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রান্তিক প্রকাশিত হয়নি। তবে আমাদের অন্যান্য মিটিং নিয়মিত হচ্ছে। আর পরিচালকদের মাঝে কোনো ঝামেলা নেই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের লাইফের প্রিমিয়াম আয় কমেছে, তবে আয় বাড়ানোর জন্য আমরা বেশ কয়েকটি ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছি। আর এজিএম হলে তখন আমরা পরিশোধিত মূলধন ও উদ্যোক্তা পরিচালকদের ন্যূনতম শেয়ার ধারণ বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারব। যদিও এ বিষয়ে আমাদের আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে। এখনও পরিচালনা পর্ষদ সিদ্ধান্ত নেয়নি।

উল্লেখ্য, প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা পরিচালকদের কাছে ৩৮ দশমিক ৮২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ১১ দশমিক ১৪ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ২০ দশমিক চার শতাংশ শেয়ার রয়েছে। আর গত ২০১৯ সাল শেষে নিট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩৩৩ কোটি টাকা। আর সেই বছরের কোম্পানিটি ১০ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দেয়।

অন্যান্য
ভ্রমন