• ১৫ অগ্রহায়ণ১৪২৯  - মঙ্গলবার, নভেম্বর ২৯, ২০২২

শেখ হাসিনার জন্মদিন, একটি মূল্যায়ন

শেখ হাসিনার জন্মদিন, একটি মূল্যায়ন

’৭৫-এর পর ভারতে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে শেখ হাসিনা ’৮১-এর ১৭ মে দেশে ফেরেন আওয়ামী লীগের নতুন নির্বাচিত সভাপতি হিসাবে। সেদিন আমার বলতে ইচ্ছে হয়েছিল, নির্বাসন থেকে বাংলাদেশ অস্তিত্বে ফিরল (Bangladesh from exile to existence)।

আমার এমন ভাবনা যে যুক্তি স্পর্শ করেছিল, তার প্রমাণ, কবি হাসান হাফিজুর রহমান শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, ‘আপনিই তো বাংলাদেশ।’ ’৯১-এর নির্বাচনি বিপর্যয়ের পর শেখ হাসিনা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন; কিন্তু জননী সাহসিকা বেগম সুফিয়া কামাল তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমাকে থাকতে হবে এবং বাংলাদেশকে বাঁচাতে হবে।’ শেখ হাসিনা সিদ্ধান্ত পালটিয়েছিলেন; তিনি ছিলেন বলেই বাংলাদেশের অর্জন এখন সারা দুনিয়ার নজরকাড়া। নজর কেড়েছেন তিনিও। তিনি বিশ্বনেতার তালিকাভুক্ত।

শেখ হাসিনার ফেরায় এমন উচ্ছ্বাসের অন্তত দুটো কারণ নির্দেশ করা যেতে পারে। এক. বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে আমরা তার কন্যাকে নেতৃত্বে পেয়েছি। কন্যার ধমনিতে প্রবাহিত পিতার রক্ত। হারানো বঙ্গবন্ধুকে যেন ফিরে পাই শেখ হাসিনাকে দেখে। সব মিলিয়ে তার বড় পরিচয় তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা। দুই. ’৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশ নির্বাসনে ছিল; দেশটা তো ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিল। অবয়ব-কাঠামোতে মুক্তিযুদ্ধ ছিল উধাও। বাংলাদেশ মিনি পাকিস্তান তকমা পেতে শুরু করেছিল। কাজেই শেখ হাসিনার ফেরা মানে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ ফেরা।

শেখ হাসিনা দলের নেতৃত্বে চার দশকের বেশি; সরকারের নেতৃত্বে প্রায় সতেরো-আঠারো বছর। উল্লেখ্য, তার নেতৃত্বেই ’৭৫-এর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরে। তার ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি। জীবনের ওপর আঘাত এসেছে উনিশ-কুড়ি বার। তার বেঁচে থাকায় অলৌকিকত্ব আছে, আছে দৈব ব্যাপারও। তবে আমরা ভাগ্যবান যে, আমরা তার নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হইনি। তার দীর্ঘ নেতৃত্ব পর্যবেক্ষণ থেকে আমরা কিছু মন্তব্য করতে পারি।

সম্মোহন : সন্দেহ নেই, শেখ হাসিনার নেতৃত্ব সম্মোহনী; এবং তা ম্যাক্স ভেবার যে অর্থে/নিহিতার্থে ধারণাটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে শেখ হাসিনার সম্মোহনী নেতৃত্ব মিশ্র; দুটো উপাদান আছে। প্রথমত, আহরিত সম্মোহন (borrowed charisma)। তিনি সম্মোহনী বৈশিষ্ট্য আহরণ করেছেন বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে। তার সম্মোহন যে, তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা। দ্বিতীয়ত, শেখ হাসিনার নিজস্ব সম্মোহনী সংযোজন, যার উৎস তার বহুবিচিত্র জনগণলগ্ন কর্মকাণ্ড। এমন সম্মোহন সৃষ্টিতে একটি ঐতিহাসিক উপাদানও বিবেচ্য। তিনি যখন দেশে ফেরেন, তখন তো ফিরেছিলেন স্বজন হারানো শ্মশানে।

এমন একজন মানুষের জনগণলগ্ন হওয়ার বিকল্প কিছু নেই। কারণ তার নিজস্ব চাওয়া-পাওয়ার জগৎ বলে কিছু নেই। আর সে কথা তো তিনি দেশে ফিরেই বলেছিলেন, ‘সব হারিয়ে আমি এসেছি আপনাদের ভোট ও ভাতের অধিকার আদায় করতে।’ এ একটি কথায় জাদু ছিল, ছিল সম্মোহন।

সম্মোহনী নেতৃত্বের সমান্তরালে শেখ হাসিনাকে রূপান্তরের নেতৃত্বও (transformational leadership) বলা যায়; যে দুটো গুণ বঙ্গবন্ধুর মধ্যেও ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সময় পেয়েছিলেন ১,৩১৪ দিন; যে সময়ে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। বাকশাল কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিশ্বের বিস্ময় হতো। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশ যে অনেক বদলে গেছে, তার অগুনতি আর্থ-সামাজিক সূচক আছে। দেশ ও দেশের মানুষের দিনবদলের পালা চলমান। যেতে হবে এখনো বহুদূর। যাব অনেক দূর। কারণ আমাদের রয়েছে স্বপ্নসারথি শেখ হাসিনা।

সৃজনশীলতা : সৃজনশীল না হলে নেতৃত্ব দেওয়া যায় না। জনতার কাজ করতে হলে সৃজনশীলতা অপরিহার্য। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনা দু’ধরনের নেতৃত্বের মিশেল-ঘটনাশ্রয়ী (eventful) এবং ঘটনা সংঘটনকারী (event-making)। আওয়ামী লীগের এক ক্রান্তিলগ্নে তিনি ঘটনাচক্রে সভাপতি হন। তিনি সভাপতি হয়ে দলকে রক্ষা করেছেন, দেশকে বাঁচানোর লক্ষ্যে নিবেদিত হয়ে অনেক ঘটনা সৃষ্টি করেছেন। অর্থাৎ সৃষ্টিশীলতায় তিনি নিজেকে নিয়ত অতিক্রম করে যাচ্ছেন।

মানবিকতা : বঙ্গবন্ধুকন্যা বঙ্গবন্ধুর মতোই তার ব্যক্তিত্বে ধারণ করেন দুস্থ মানুষের জন্য কল্যাণ-কামনা। এক্ষেত্রে শেখ হাসিনাকে নিয়ে অনেক কথাই বলা যায়; কিন্তু বলি শুধু রোহিঙ্গাদের কথা। নিজ বাসভূমে পরবাসী হয়ে প্রায় দশ-বারো লাখ রোহিঙ্গা এখন বাংলাদেশে আশ্রিত-অতিথি। অতিথি সৎকারের জন্য তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন ভাসানচর প্রকল্প। তাদের নিজ দেশে ফেরানোর কূটনীতিতে কমতি-ঘাটতি নেই। কাজেই শেখ হাসিনার জন্য অভিধা এসেছে ‘মানবতার জননী’ (Mother of Humanity); এবং তা-ও আবার বিদেশ থেকে।

সাহসিকতা : বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব ভাষ্যে তার সাহসের কথা আছে; তার কন্যার মধ্যেও সাহস থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। বিবেকী সাহসের উৎস আত্মবিশ্বাস, যা আমরা পিতা-পুত্রীর মধ্যে দেখেছি/দেখছি। বঙ্গবন্ধুর সাহসের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ; শেখ হাসিনার সাহসের ফসল অসম্ভবকে সম্ভব করা দিনবদলের হাওয়া লাগা আজকের বাংলাদেশ, এবং তা করোনা অতিমারি সত্ত্বেও।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করা সম্ভব হয় শেখ হাসিনার সাহসের জন্য। বঙ্গবন্ধুর খুনিরা কোনো দিন ভাবতে পারেনি যে, তাদের বিচার হবে, রায় কার্যকর হবে। ’৭৬-এর আগস্ট মাসে লন্ডনের আইটিভিতে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কর্নেল রশীদ দম্ভ নিয়ে বলেছিল, ‘আমি শেখ মুজিবকে হত্যা করেছি। তোমাদের সাহস আছে আমার বিচার করার?’

তার দম্ভের কারণ ছিল দায়মুক্তি অধ্যাদেশ (সেপ্টেম্বর ১৯৭৫) ও পাক-মার্কিন সমর্থন। ’৯৬-র ১২ নভেম্বর সংসদে দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিল করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার করার অসম্ভব সাহস দেখিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। জাতিকে তিনি কলঙ্কমুক্ত করেছিলেন।

পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের নাটকের কথা আমরা জানি। অর্থায়ন বন্ধ হলো এমন একটি মেগা প্রকল্পের। এমন সংকটকালে শেখ হাসিনার সাহসী উচ্চারণ ছিল, আমরা পদ্মা সেতু তৈরি করব নিজেদের টাকায়। পদ্মা সেতু হয়েছে। সাহসী সিদ্ধান্তের কৃতিত্ব শেখ হাসিনার; আর অর্থ জোগান দেওয়ার কৃতিত্ব বাংলাদেশের মানুষের, তাদের টাকায় এ সেতু হলো। ’৭১-এ বিজয় ছিনিয়ে এনে লড়াকু বাঙালি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল; নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু বানিয়ে বাঙালি একই কাজ করল। কবি সুকান্তের পঙ্ক্তি তো নিরর্থক নয়-

সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী

অবাক তাকিয়ে রয়ঃ

জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার

তবুও মাথা নোয়াবার নয়।

একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাঙালি লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছিল; এখন শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তে হয়েছে পদ্মা সেতু। বাঙালি তো মাথা নোয়াবার জাত নয়। শেখ হাসিনার সাহস প্রায় অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।

নারী উন্নয়ন : শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশে নারী প্রগতি বোঝানোর জন্য পশ্চিমে সত্তর-আশি দশকের জনপ্রিয় গায়িকা হেলেন রেড্ডির গান থেকে কলি ধার করছি-

আই অ্যাম উওম্যান, হিয়ার মি রোহ্র

ইন নাম্বারস টু-উ বিগ টু ইগনোর,

......................................

ইফ আই হ্যাভ টু, আই ক্যান ডু এনিথিং-

আই অ্যাম স্ট্রং,

আই অ্যাম ইনভিন্সিব্ল,

আই অ্যাম উওম্যান!

(শেষ বাক্যটি খুব জোর দিয়ে গাইতেন)

২০১০-এ ঘোষিত নারীনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু। তারপর তো অনেক পথচলা হয়েছে। শুধু রাষ্ট্রপতি বা নভোচারী হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের নারী এখন সব অবস্থানে পৌঁছে গেছে। নারীর অগ্রযাত্রা নিশ্চিত হয়েছে শেখ হাসিনার আমলে।

প্রবৃদ্ধি/উন্নয়নের রূপকার : মনে আছে, বাংলাদেশের জন্মলগ্নে ড. কিসিঞ্জারের অভিসম্পাত ছিল, দেশটি তলাবিহীন ঝুড়ি হবে। বঙ্গবন্ধুর আমলেই জাতীয় গড় প্রবৃদ্ধি সাতের ওপর হয়ে ঝুড়িতে জমা হয়েছিল বেশ কিছু। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর, ’৭৬-এ দু’জন উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ- জাআস্ট ফারল্যান্ড ও জে.আর. পার্কিনসন-বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনটি তীর্যক মন্তব্য করলেন। এক. বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্বের কঠিনতম সমস্যা। দুই. বাংলাদেশের উন্নয়ন হলে, সব দেশেরই উন্নয়ন হবে। তিন. বাংলাদেশের উন্নয়ন হলেও, অন্তত দুইশ’ বছর লাগবে। কিন্তু ২০১৬-তে শেখ হাসিনা যখন প্রধানমন্ত্রী, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে উন্নয়নের ‘রোল মডেল’ হিসাবে তকমা দেয়। এখন তো দেশটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে মধ্যম আয়ের অবস্থানে উন্নীত, সারা বিশ্বের বিস্ময়।

সংস্কৃত প্রবচন আছে-রত্ন কর্ষতি পুরঃপরমেক/স্তদগতানুগতিকোন মহার্যৎ-অর্থাৎ একজনই আগে পথ তৈরি করে দেন। পরে সে পথ দিয়ে যাত্রায়াত করার লোক দুর্লভ হয় না। বঙ্গবন্ধুর তৈরি করা পথে শেখ হাসিনা চলছেন, যদিও তার পথচলা সহজ নয়, বেশ কঠিন।

শেখ হাসিনার জন্মদিনে আমরা বলতে বাধ্য ‘জন্মদিনে বলতে এলাম, শুভ তোমার জয়ন্তী।’

জয়তু শেখ হাসিনা।

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস্ (বিইউপি)


ভ্রমন