ধর্ষণের জন্য নারীর পোষাক দায়ী নয় কিছুতেই

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

ধর্ষণ বিষয়ে গত দুই বছরে আমি কমপক্ষে দশটা আর্টিকেল লিখেছি, ফেসবুক স্ট্যাটাস অসংখ্য। তবু এখনো ধর্ষণ, বিশেষ করে শিশুধর্ষণের খবর শুনলেই আমার হাত নিশপিশ করে লেখার জন্য। সপ্তাহ দু’এক আগে একটি দশবছরের শিশুকে ধর্ষণের পর বটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা এসেছিল পত্রিকায়। তারপরই একের পর এক- মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপর হামলা, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর প্রয়াণ, সাতই মার্চে বিভিন্ন স্থানে নারীদের উপর যৌন নির্যাতন, নেপালে বিমান দুর্ঘটনা, স্ক্রিনশট স্ক্যান্ডাল- সবমিলিয়ে এই নির্মম শিশু ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনা নিয়ে বিচলিত হবার সুযোগ আমরা খুব একটা পাইনি। তারপরই এলো এই বিষয়ে মোশাররফ করিমের মন্তব্য এবং চাপে পড়ে ক্ষমা প্রার্থনা।

আমার গলায় চাকু বসিয়ে জিজ্ঞেস করুন, তবু আমি বলব- মোশাররফ করিম ঠিকই বলেছেন, ধর্ষণের জন্য নারীর পোষাক কিছুতেই দায়ী নয়। সিঙ্গাপুরে আছি গত তিন সপ্তাহ ধরে, এখানে মেয়েরা বেশিরভাগই স্লিভলেস টপ এবং হাফপ্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ায়। ধর্ষণের জন্য পোষাক দায়ী হলে এখানে প্রতিদিন গণধর্ষণ ঘটত, কিন্তু ধর্ষণ শব্দটি এখানের জনজীবনে প্রায় অপরিচিত একটি শব্দ।

ধর্ষণ একটা মনস্তাত্বিক ব্যাপার। এই বিষয়ে কিছুটা পড়াশোনা করেছি আমি, বিভিন্ন গবেষণার ফলাফলে যা পড়েছি তার মর্মার্থ অনেকটা এরকম- হয়তো লোকটা নিজে শৈশবে নির্যাতিত হয়েছিল, হয়তো অতিমাত্রায় পর্ণ দেখার ফলে তার যৌন সুড়সুড়ানি বেড়ে গিয়েছিল, হয়তো সে মাতাল ছিল, হয়তো সে তার মাকে ঘৃণা করে, হয়তো সে নিয়ন্ত্রণকামী, হয়তো তার জিনেই হিংস্রতা রয়েছে। কিন্তু যেসব মৌলিক কারণের অস্তিত্বের ফলে এসব অবব্যহিত কারণের উপস্থিতি ঘটে থাকে, সেসব সম্পর্কে মানুষের তেমন একটা ধারণাই নেই বলে দাবী করেন বিবর্তনবাদী বৈজ্ঞানিকরা। আজ পর্যন্ত গোঁড়া ধার্মিক ছাড়া আর কাউকে বলতে শুনিনি যে ধর্ষনণের জন্য নারীর পোষাক দায়ী।

যে লোক ধর্ষকামী সে মৃত লাশকেও ধর্ষণ করে। চার মাসের শিশু, দশ বছরের মেয়ে, এমনকি অবলা পশুও তার হাত থেকে রেহাই পায় না, তবুও বলবেন ধর্ষণের জন্য পোষাকই দায়ী? তবুও এই যৌক্তিক কথাটি বলবার জন্য মোশাররফ করিমকে ক্ষমা চাইতে হবে? এই জাতিকে নিয়ে গর্ব বোধ করব আমরা?

পত্রিকায় আসা সবধরনের খারাপ খবরের মধ্যে শিশুধর্ষণ আমাকে সবচেয়ে বেশি বিচলিত করে যদিও এসব ঘটনাকে এড়িয়ে যাওয়াই সম্ভবত সৃজনশীল মনের মানুষের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। আমার যেসব সুশীল বন্ধুরা নিয়মিত গান কবিতা শেয়ার করেন, দুর্ঘটনায় মৃতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে স্ট্যাটাস দেন কিন্তু ধর্ষণ/শিশুধর্ষণ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকেন, তাদের নীরবতা দেখে ভাবি তারা এসব নিয়ে আসলে কী ভাবছেন? প্রতিবাদ করে কী হবে, শেয়ার তো হচ্ছে, কিছু লাভ হচ্ছে না, তাই তো?

কিন্তু আমি ভাবি ধর্ষিত মেয়েটি যদি আমি হতাম, নির্যাতিত শিশুটি যদি আমার মেয়ে হতো, আমি কী চাইতাম? আমি কি চাইতাম না প্রতিটি মানুষ এর প্রতিবাদে সরব হোক? আমি কি চাইতাম না পুরা দেশ প্রতিবাদে ফেটে পড়ুক? তনুর ধর্ষণ আর হত্যার জন্য অনেক আন্দোলন হয়েছিল, মানব বন্ধন হয়েছিল। প্রতিটি ধর্ষণের জন্য কেন তা হচ্ছে না? আমরা কি ক্লান্ত হয়ে পড়ছি? নাকি ধর্ষিত মেয়েটি ইউনিভার্সিটির ছাত্রী হলে, শিল্প সাহিত্যের চর্চা করে থাকলে আমাদের বিবেক বেশি জাগ্রত হয়ে উঠে? শ্রেণী বৈষম্য কি এক্ষেত্রেও কাজ করে?

প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা আমাকে ব্যথিত, মর্মাহত, স্তম্ভিত করে দেয়। ধর্ষণ বিষয়ে লেখা স্ট্যাটাসে আমাকে কোরান পড়ার উপদেশ দেয় সম্ভাব্য ধর্ষকেরা, তারা বলে, ‘এতো কথা বলে লাভ নেই, ধর্ম মেনে চললেই এসব বন্ধ হবে, নারীরা পোষাক আশাকে সভ্য হলেই ধর্ষণ এড়িয়ে চলতে পারবে। আমি ভাবি ধর্মটা কে মানবে? আমি? আপনি? না সম্ভাব্য ধর্ষকেরা? যে পৃথিবীতে ধর্মের পুরোহিতরাই ধর্ষণে লিপ্ত হয় সেই পৃথিবীতে কী দিয়ে ধর্ষণ বন্ধ করা সম্ভব?

ধর্ষণের বিরুদ্ধে কথা বলতে আরো একটি মন্তব্য শুনতে হয়, ‘সব পুরুষ সমান নয়’। এবার একটু থামুন আপনারা। সব পুরুষ এক নয়, সব পুরুষ ধর্ষক নয় এরকম একটা সত্যি কথা চেঁচিয়ে বলবার কিছু নেই। একথার সত্যতা যেমন ধর্ষকরা জানে, তেমনি সাধুরাও জানে। তবু কেন কিছু মেয়েরা এই সাধারণীকরণ করছে, সকল পুরুষ থেকে সাবধানতা অবলম্বন করতে বলছে, এর কারণটা বুঝতে চেষ্টা করুন।

আপনি জানেন সব বাঘ মানুষখেকো হয় না তবু বাঘের নাম শুনলেই আঁতকে উঠেন কারণ কোন বাঘটি মানুষখেকো তা চেহারা দেখে বুঝবার কোন উপায় নেই। আপনি জানেন সব সাপ বিষাক্ত হয় না তবু শুধু সাপ নয়, কেঁচো দেখলেও ভয় পান। আপনার সৌভাগ্য বাঘ আর সাপের সাথে আপনাকে বাস করতে হয় না, কিন্তু একটা মেয়েকে পুরুষের সাথে বাস করতে হয়। তাদের সবার চেহারাই বেশ নিরীহ অথচ কখনো বিবাহিত স্বামী, কখনো ধর্মীয় শিক্ষক, কখনো জন্মদাতা বাবা তার কাছে ধর্ষকের ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করে। পুরুষদের অনুরোধ করব- আপনার জন্মও একজন নারীর গর্ভে, নারীর অসহায়ত্বকে বুঝতে চেষ্টা করুন।

একটা মেয়ে ঘর থেকে বাইরে পা দেবার সময় জানে না যে রিক্সায় চড়ছে তার চালক ধর্ষক কী না, যে বাসে উঠছে সেই বাসের ড্রাইভার ধর্ষক কী না, যে বন্ধুর জন্মদিনের নেমন্তন্ন রাখতে যাচ্ছে সে ধর্ষক কী না, যে চাচার সাথে শহরে চিকিৎসার জন্য যাচ্ছে সে ধর্ষক কী না, যে বাবার কাছে নিরাপত্তার আশা নিয়ে ঘরে ফিরছে সেই জন্মদাতা পিতাই ধর্ষক কী না। ঘটনা ঘটবার আগে জানবার কোন উপায় নেই। কী সীমাহীন অসহায়ত্ব একটি মেয়ের ভাবতে পারেন?

আপনার সৌভাগ্য আপনি মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ করেননি। কাজেই মেয়েদের এসব সাধারণীকরণে যখন আপনার পৌরুষ কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত হয়, একটু ধৈর্য ধরুন। নিজের পুরুষত্বকে এই কালিমা থেকে মুক্ত করতে সচেষ্ট হোন, মেয়েদের জন্য ভরসার একটা পরিবেশ তৈরি করার জন্য কাজ করুন। মেয়েদের দেহ আর পোষাক নিয়ে অশ্লীল মন্তব্যের প্রতিবাদ করুন। একটি মেয়েকে সামন্যতম নির্যাতনের শিকার হতে দেখলে রুখে দাড়ান। আপনি যখন জানবেন একজন পুরুষ হিসেবে আপনি সঠিক অবস্থানে আছেন তখন চেঁচিয়ে নিজের ভালোমানুষী জাহির করবার প্রয়োজন হবে না।

পৃথিবীর যেসব দেশে নারীরা স্বল্পবসনা সেইসব দেশে ধর্ষণের হার আমাদের দেশের তুলনায় অনেক কম, কাজেই নারীর পোষাক নিয়ে কথা বলা বন্ধ করুন। ধর্ষণের বিরুদ্ধে আরো সোচ্চার হোন, প্রতিবাদ মুখর হোন। প্রতিটি নারীর ধর্ষণ মানেই আমাদের বিবেকের ধর্ষণ। নিজের ঘরের নারীদের আরো ক্ষমতাবান করে গড়ে তুলুন। আত্মরক্ষার বিভিন্ন পদ্ধতি শেখানোর ব্যবস্থা করুন। চাচা মামাদের অবিশ্বাস করতে শেখান। এতে হারাবার কিছু নেই। নারীর সার্বিক ক্ষমতায়ন ছাড়া একটা দেশে ধর্ষণের সংখ্যা কিছুতেই কমিয়ে আনা সম্ভব নয়।

জেসমিন চৌধুরী : অভিবাসী শিক্ষক, লেখক ও অনুবাদক; ম্যানচেস্টার, ইউকে।
jes_chy@yahoo.com

Share.