‘মেয়েটারই তো দোষ’ বলবার আগে ভাবুন

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

ধর্ষণের বেলায় নির্যাতিতের পক্ষে দাঁড়াতে কিছু মানুষের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যায় কেন? কেন কেউ কেউ ভাবে, মেয়েটিরই দোষ?

অন্য সব অপরাধে অপরাধী কে, এ প্রশ্নই আগে আসে। কিন্তু ধর্ষণে লোকে খুঁজতে থাকে মেয়েটিকেই। মেয়েটিকে প্রশ্ন করবে, তুমি কেন একা বাইরে গিয়েছিলে? তোমার পোশাক, চালচলন ঠিক ছিল তো? এক হাতে কি আর তালি বাজে? আত্মীয়-প্রতিবেশীরা ভাববে, মেয়েটা নষ্ট হয়ে গেল, ওর এখন কী হবে? যতবার এসব প্রশ্ন ওঠানো হবে, ততবার শারীরিক ধর্ষণের অভিঘাত তথা মানসিক ধর্ষণ ঘটবে। এটা ধর্ষণকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে।

মূল নির্যাতনটা ধর্ষক করলেও তার ভয়াবহতা বাড়ে এসব মানসিক অত্যাচারে। আইন বলবে, আপনি প্রমাণ করুন। পুলিশ বলবে, ঘটনাটার বিবরণ দিন। আসামিপক্ষের উকিল বারবার কীভাবে হলো, কেমন করে হলো, কে তখন কী করেছিল-এ জাতীয় প্রশ্ন করে মজা পাবেন। সমাজের দরবারে বা আইনের আদালতে নিপীড়িত নারীরা বোধ করেন ধর্ষকের নয়, তাঁরই বুঝি বিচার হচ্ছে। ধর্ষক শরীরের ওপর আক্রমণ চালালেও ফরিয়াদির সম্মানহানির কাজটা জেরার নামে সমাজই করে থাকে। এমনকি ভেঙে পড়া কিংবা ঠিকমতো উত্তর দিতে না পারা মেয়েদের দেখে কারও কারও ভাবার সুবিধা হয় যে সমস্যা বোধ হয় মেয়েটিরই। এভাবে মেয়েটির মর্যাদা যত কমে, ততই ধর্ষণের ঘটনার জন্য তাঁকেই দায়ী করার প্রবণতা বাড়ে।

নারীকে পুরুষের যৌন প্রস্তাবে রাজি অবস্থায় থাকতে হবে, না থাকলে তার ওপর জোর খাটানো যাবে-ধর্ষণপ্রবণতার মূলে আছে এই মানসিকতা। পুরুষের বাসনার প্রতি ইচ্ছুক নারীর ছবি ও ভাবমূর্তি ঝুলিয়ে রাখা হয় বিলবোর্ডে। সিনেমা-টিভি ও মোবাইলের স্ক্রিনে একটানা চলে যৌন হাতছানি। বলিউড, ঢালিউড ও হলিউডের অজস্র সিনেমা ও বিনোদন আইটেম কি আসলে সফট সেক্স প্রোডাক্ট নয়? রিয়েলিটি শোতে বালিকা-কিশোরীদেরও অবলোকনকামের সামগ্রী বানানো হয় নাচে, গানে, পোশাকে। চোখের কামনা পূরণের অভ্যাস হঠাৎ বাস্তব লালসায় পরিণত হয়। এভাবে পুরুষালি দৃশ্যমাধ্যমে ‘ইচ্ছুক নারীর’ ছবি তুলে ধরে বাস্তবের তটস্থ নারীর ভাবমূর্তি ঢেকে ফেলা হয়। এসব দেখে দেখে একশ্রেণির পুরুষ প্রেম ও যৌনসম্পর্কের বেলায় নারীর নিজস্ব ইচ্ছাকে পাত্তা না দেওয়ার লাই পায়। এই ভাবরসে হাবুডুবু খাওয়া পুরুষদের মনে ‘রেডিমেড’ নারী পাওয়ার বাসনা এভাবে তৈরি হয়। ব্যবসা ও বিনোদন এভাবে নারীকে হুমকির মধ্যে ফেলে।

ধর্ষণ হলো সবল করে তোলা পুরুষের দ্বারা দাবিয়ে রাখা নারীর ওপর যৌন-সন্ত্রাস। পুরুষের এই সবলতা যতটা না গায়ের, তার চেয়ে বেশি আইন-অর্থনীতি-রাজনীতি ইত্যাদির জোগান-রিএনফোর্সড কংক্রিটের মতো। এটাকে নারীর জন্য নিরপেক্ষ বাস্তবতা বা দেশ বলে না। এ জন্যই ধর্ষণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ধর্ষণের উপযুক্ত বিচার হওয়াই বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অধিকাংশ অভিযোগই থানা পর্যন্ত যেতে পারে না। গরিব হলে উপেক্ষিত হয়, কিংবা নগদ অর্থ দিয়ে সালিসে নারীর বিরুদ্ধে ‘মীমাংসা’ হয়।

ধর্ষণ শুধু একা পুরুষালি ক্ষমতার কাজ না। এর সঙ্গে লাগে দলের ক্ষমতা বা টাকার ক্ষমতা বা প্রশাসনিক খুঁটির জোর। অধিকাংশ ধর্ষককেই দেখা যাবে কোনো না কোনো সম্পদ, ক্ষমতা ও প্রভাবের মালিক। মাফিয়া রাজনীতি যেসব শিয়াল-নেকড়ে পোষে, ধর্ষণ তাদের সিলেবাসের অংশ। ধর্ষণের মামলা করা কঠিন, করলে প্রমাণ করা কঠিন, আসামিকে ধরা কঠিন, নির্যাতিত বা সাক্ষীদের নিরাপদ রাখা কঠিন, তদন্ত নিরপেক্ষভাবে চালাতে পারা কঠিন। পরিশেষে শাস্তি হওয়া কঠিন।

অতএব, ধর্ষণ ধর্ষকের একার কাজ না, সমাজ-রাষ্ট্রের অনেক কিছুকেই ধর্ষক তার পক্ষে পায়। ধর্ষণের শিকার হয়ে নারীর আত্মহত্যায় এই সত্য প্রমাণিত হয়। সবাই মিলে আক্রান্তকে অসহায় ও অক্ষম করে তুলে তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এটাই হলো দ্বিতীয় ধর্ষণ, যা করা হয় মানসিকভাবে। আর এ ব্যাপারে মুখ বুজে থাকা হলো তৃতীয় ধর্ষণ, যা করে যাই আমরা, যারা ভাবি আমরা সাতেও নাই পাঁচেও নাই।
নারী-পুরুষে আদিতম বিনিময় সম্পর্ক হলো যৌনসম্পর্ক। সেই বিনিময়ে শোষণ-নির্যাতনও গোড়া থেকেই আছে। আবার আধিপত্যহীন যৌনসম্পর্ক জীবনেরই উপহার। যৌন নিপীড়নের সংস্কৃতি থেকে বেরোতে না পারলে এই উপহার থেকে আমরা বঞ্চিত থেকে যাব। ‘যে জীবন দোয়েলের-ফড়িংয়ের আমাদের সঙ্গে তার হবে নাকো দেখা’। পরস্পরের এই মুক্তি ছাড়া নারী-পুরুষের ভালোবাসা রূপকথাই হয়ে থাকবে।

যে দেশের মুক্তিযুদ্ধে লাখো নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যে দেশের মুক্তিযোদ্ধারা এর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, জান দিয়েছে, সেই দেশের স্বাধীনতার চেতনা মানে তো ধর্ষণবিরোধী চেতনাও। কোথায় গেল সেই চেতনা? মাথাটাকে তাই বালু থেকে তুলে ভাবতে হবে, গলদটা কোথায়?

Share.