দেশের শ্রমবাজার ভারতের দখলে, কী করণীয় বাংলাদেশের!

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

প্রায় ‘পাঁচ লাখ ভারতীয় বাংলাদেশে অবৈধভাবে কাজ করছে’ বলে হঠাতই বেশ শোরগোল শুরু হয়েছে যোগাযোগ মাধ্যমে। যদিও, এ ব্যাপারে যারা খোঁজ খবর রাখেন তারা বেশ ভালোভাবেই জানেন যে এটা দীর্ঘ দিনের ধারাবাহিকতায় এ অবস্থায় এসেছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বৈধ-অবৈধ মিলে ভারতীয়দের সংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখ বা ছয় লাখ হলেও, রেমিট্যান্সের আকার বেশ বড়, সেটা ১০.২২৫ বিলিয়ন ডলার (সূত্র: পিউ রিসার্চ সেন্টারের রেমিট্যান্স ফ্লো ওয়ার্ল্ডওয়াইড ২০১৬)। প্রকাশিত রেমিট্যান্স এটা হলেও, বাস্তবে এর চেয়ে বেশি হওয়াও সম্ভব। কারণ, নন-ব্যাঙ্কিং ফান্ড ট্রান্সফার হয়ে থাকতে পারে যেগুলো হিসেবে আসে না। ফলত ভারতের জন্য বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আয়ের উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম।

এটাকে নেহায়েত আবেগী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ খুব বেশি নাই। দেশপ্রেম বা ভারতবিরোধী অজুহাত দিয়ে প্রতিবাদ করে কিছুটা সুখ পাওয়া যাবে হয়তো, কিন্তু আখেরে ফল কিছুই হবে না। বড়জোর তারা অবৈধ থেকে বৈধ হবে আর সরকার কিছু ট্যাক্স পাবে।

অনেকে বলছেন, আমাদের দেশে এতো বেকার থাকা সত্ত্বেও এতো ভারতীয় কাজ করে। এখানে বোঝার ব্যাপার আছে। আমাদের দেশে যারা বেকার, তাদের চাকরি ভারতীয়রা খাচ্ছে না। বুঝতে হবে, রেমিট্যান্স ছাড়াও আমাদের দেশে ভারতীয় বা অন্যান্য এক্সপ্যাটদের পেছনে কোম্পানিগুলোর আরো খরচ আছে। সাধারণত এসব এক্সপ্যাটদের থাকা, ক্লাব ফি, বাচ্চাদের এডুকেশন এগুলোও কোম্পানিকে বহন করতে হয়। তার মানে রেমিট্যান্সের অংক বাদেও, বাংলাদেশি কোম্পানিগুলোর খরচ আরো বেশি, গড়পড়তা হিসেবে বছরে (২০১৬) প্রায় ১৩ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়াও ক্রয় ঋণের (এলসি) মাধ্যমে বিদেশ থেকে বিভিন্ন টেকনিক্যাল নো-হাউ সার্ভিস কেনার ব্যাপারটাও এর মধ্যে নাই, এটা আমদানি হিসেবেই গণ্য হয়।

প্রশ্ন হচ্ছে, এখনকার চরম প্রতিযোগিতামূলক বাজারে একটি দেশীয় কোম্পানি কেন দেশে সস্তা শ্রম রেখে বিদেশি লোক নিয়োগ দেবে? কারণ এই সমস্ত এক্সপ্যাটদের জায়গায় সমান দক্ষতাসম্পন্ন লোকবল বাংলাদেশে নাই। নাই মানে নাই-ই। এখন হয়তো ভারতীয়দের আধিপত্য, কিন্তু শ্রীলঙ্কা বা চীনারাও কম নাই বাংলাদেশে।

এই যে দক্ষতা ও জ্ঞানের সংকট, এর কারণ কী? গত এক যুগে বাংলাদেশে ব্যবসা বাণিজ্যের যে প্রসার ঘটেছে, তার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা যোগ্য মানবসম্পদ প্রস্তুত করতে পারিনি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সেদিকে দিয়ে বিচার করলে এখনো মান্ধাতা আমলের। গত দুই যুগের পোশাক শিল্পের দ্রুত অগ্রসরতার মধ্যেও আমাদের বলার মত কোন ভালো প্রতিষ্ঠান নাই যেখানে ভালো প্রকৌশলী বের হয়, একটা দুইটা টেক্সটাইল কলেজ ছাড়া। ফলে এতবড় যন্ত্রনির্ভর শিল্প কে চালাবে? কারখানায় উৎপাদন কে দেখবে? সরকার বাদ দিলেও, বেসরকারি খাতের লোকজনও এদিকে খুব বেশি নজর দিচ্ছেন বলে মনে হয় না। এর কারণ হচ্ছে, বর্তমান সময়ে আমাদের শিক্ষাখাত একটা বাণিজ্য এবং নৈরাজ্য ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। একটা ঘর ভাড়া করে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কিছু শিক্ষককে দিয়ে ব্যাচের পর ব্যাচ বিবিএ, এমবিএ বের করে বেশ লাভবান হতে পারলে কে যায় এতো মানসম্পন্ন শিক্ষার দিকে।

আরেক অভিশাপের নাম অনার্স মাস্টার্স। মানুষের মাথার মধ্যে, মগজের মধ্যে ঢুকে গেছে তাকে অনার্স মাস্টার্স পাশ করতে হবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়য় থেকে প্রায় সাত আট বছর পড়াশোনা করে দর্শনের যে হাজার হাজার গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে, এদের ভবিষ্যৎ কী? বাংলা বা রাষ্ট্রবিজ্ঞান? শুনতে খারাপ লাগলেও সত্যি, সরকারি চাকরি আর কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে, এদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। সামনে আরো বড় সংকট আসছে। কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা পৃথিবীতেই এখন দক্ষতা ভিত্তিক পেশার জয়-জয়কার। যে যা পারে, তাকে সেটাই বেশ ভালোভাবে পারতে হবে।

গত দশকে বেশ কিছু ব্যবসা খাত দক্ষিণ এশিয়ার দিকে শিফট হয়েছে। পোশাক খাত বাদ দিলেও, সামনে ইলেক্ট্রনিক্সের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু হবে দেশে, প্রসেস শুরু হয়ে গিয়েছে। ইউরোপ-আমেরিকা-জাপান-চীন হয়ে এই শিল্প এখন বাংলাদেশ ভারত ভিয়েতনাম পাকিস্তানে আসতে শুরু করেছে। আর কয়েক বছরের মধ্যেই গাড়ি উৎপাদন শুরু হবে বাংলাদেশেই, সেটা বিদেশি ব্র্যান্ড হোক বা দেশিই হোক। আর বাংলাদেশও এখন খুচরা ব্যবসা থেকে ক্রমশই উৎপাদনমুখী ব্যবসার দিকে মনযোগী হবে। এছাড়াও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ কিছু ভারি নির্মাণ শিল্পও আসবে। রয়েছে বিশাল প্রযুক্তি খাত এবং কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প। কিন্তু দক্ষ জনবলের জায়গায় আমরা কি প্রস্তুত? দক্ষ জনবল তৈরি হবার কোনো রাস্তা কি আছে? দেখা যায়? বিশ্ববিদ্যালয়য়ের আর্টস আর বিজনেসের লাখ লাখ শিক্ষার্থী কি পারবে এই দায়িত্ব নিতে? পারবে না। এরা বেকার থেকেই যাবে। উদ্যোক্তারা স্বভাবতই বাইরে থেকে লোক আনবে, ব্যবসা তো আর হাতছাড়া করা যায় না। অটোমেশনের এই যুগে, দক্ষ লোকবল না থাকলে এই সমস্যা থাকবেই।

আমাদের একটা বিশাল সুযোগ ছিল দেশের বাইরে অদক্ষ জনবল রপ্তানিকারক থেকে ক্রমশ দক্ষ জনবল রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার। আশির দশক থেকে আমরা বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক পাঠাচ্ছি, এখন পর্যন্ত দক্ষ শ্রমিশক্তি রফতানিতে যেতে পারলাম না। পারলে, জ্ঞানবিদ্যা ও কারিগরি দক্ষতা আমরা দেশেও ব্যবহার করতে পারতাম। আর বৈদেশিক মুদ্রাও হুমকির সম্মুখীন হতো না। এদিক দিয়ে ভারত, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা ও ভিয়েতনাম অনেক এগিয়েছে। আমরা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই রয়ে গেছি।

তারপরও আমাদের যেসব মেধাবীরা দেশের বাইরে বিভিন্ন খাতে সুনামের সাথে কাজ করছেন তারাই চাইলে কিছুটা পারেন এই জায়গাটায় কাজ করতে। হাজার মাইল দূরে পড়ে থাকা এইসব মেধাবীরা কি দেশে আসতে চায়? আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে, চায় কিন্তু পারে না। এখানে সুশাসনের প্রশ্নটা জড়িত। যে লোক বিদেশে হ্যান্ডসাম ইনকাম করে, একটা মোটামুটি সিকিরড লাইফ পার করছে সে দেশে আসবে কেন? টাকা বেশি আয় করতে পারলেও আসবে না, কারণ, এই দেশ গুন্ডারা চালায়। এখানে ট্যাক্স আছে কিন্তু রাষ্ট্রীয় কোন সেবা নাই। জানমালের নিরাপত্তা নাই। শিক্ষার বন্দোবস্ত নাই। চিকিৎসার ব্যাপারটি ভয়াবহ। দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত সবগুলো সংস্থা। চোর-বাটপারেরা সমাজের মাথা। রাস্তা-ঘাট-অবকাঠামোর অবস্থা এমন যে, ঢাকার বাইরে গেলে মনে হয় দেশের বাইরে যাওয়া এর চেয়ে সহজ। বিচার নাই, ইনসাফ নাই। এগুলো রাজনৈতিক কোনকিছু না, ফ্যাক্ট। সব সরকারের আমলের অবস্থাই একই রকম ছিল, উন্নতি না হয়ে বরঞ্চ অবনতির দিকে। এই একই কারণে শত সংগ্রাম করেও যারা একটু মেধার স্বাক্ষর রাখতে পারছেন, তারাই উড়াল দিচ্ছেন বিদেশে। এই উড়াল ঠেকাবে কে?

তবু আশার আলো কাউকে না কাউকে তো জ্বালতেই হয়। এই আলো সরকারকেই জ্বালতে হবে। সমস্যার মূলে হাত দিতে হবে। বেকার তৈরি না করে দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কারিগরি এবং বিশেষায়িত শিক্ষার ব্যাপক প্রচলন করতে হবে। যারা নিজেদের ডিসিপ্লিনে পৃথিবীর যে কারো সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারবে। আর ব্যবসার আকার-প্রসার বাড়ানোর জন্য এখনি দীর্ঘ মেয়াদি এবং যথাযথ পরিকল্পনা না নিলে, আসন্ন সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাবে না। এক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল মালয়েশিয়া। ১৯৬৯ সালে নেয়া নিউ ইকোনোমিক পলিসি (এনইপি) এবং তারপর ১৯৯৬ সাল থেকে নেয়া প্রতি পাঁচ বছর মেয়াদে ‘প্রথম মালয়েশিয়া পরিকল্পনা ১৯৬৬-৭০’, ‘দ্বিতীয় মালয়েশিয়া পরিকল্পনা ১৯৭১-৭৫’, ‘তৃতীয় মালয়েশিয়া পরিকল্পনা ১৯৭৬-৮০’, ‘চতুর্থ মালয়েশিয়া পরিকল্পনা ১৯৮১-৮৫’, ‘পঞ্চম মালয়েশিয়া পরিকল্পনা ১৯৮৬-৯০’, ‘ষষ্ঠ মালয়েশিয়া পরিকল্পনা ১৯৯১-৯৫’, সপ্তম মালয়েশিয়া পরিকল্পনা১৯৯৬-২০০০’। এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনাগুলো দেখলে বোঝা যাবে, একটা দক্ষ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন একটা অর্থনীতিকে কি দিতে পারে। মালয়েশিয়ার কথা এই কারণে বলা যে, বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক ধারা, তার সাথে মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ইতিহাসের মিল পাওয়া যায়। আর তা না হলে, অকারণে একে ওকে দোষ দিয়ে বেড়াতে হবে আর নিজে না খেয়ে থাকতে হবে, নৌকায় বিদেশ পাড়ি জমাতে হবে, অত্যাচারিত হতে হবে, বিদেশে বেড়াতে গেলে আলাদা লাইনে দাঁড়িয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার ধমক খেতে হবে।

একটা বিষয় বলে শেষ করতে চাই। শুনতে অত্যন্ত খারাপ শোনালেও, লজ্জা লাগলেও এটা সত্যি যে, বাংলাদেশের শিক্ষার মান এখন এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, এখানে, সাধারণ মানের একটি কলেজ থেকে পাশ করা একজন সাধারণ আর্টস বা সমাজ বিজ্ঞান এমনকি বাণিজ্যের গ্র্যাজুয়েটের চেয়ে ড্রাইভিং জানা একজন অশিক্ষিতের ভবিষ্যৎ নিরাপদ। আমাকে গালি দেন দেন, কিন্তু নিজেই চিন্তা করুণ, মন থেকে মেনে নিতে পারি বা না পারি, এটা এখন একটা ফ্যাক্ট। এখন চলছে দক্ষতার যুগ, কেরানিগিরির যুগ আমরা বহু আগেই পার হয়ে এসেছি।

উৎসঃ দ্যা জবান

Share.