১৯৭১: মিশরে বাংলাদেশের এক হারানো অধ্যায়

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

স্বাধীনতার মাস এই মার্চ। আমরা বাঙ্গালি জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি আমাদের শহীদদের। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি অনেকে ভিন্নভাবে দেশের পক্ষে জীবনবাজি রেখে লড়েছেন। আজ আমি আপনাদের একজন কূটনৈতিক মুক্তিযোদ্ধার কথা জানাচ্ছি। ইতিহাসের অতলে যাদের কথা হারিয়ে গেছে। তিনি সরাসরি হয়ত সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি, তবে তার অবদানও বেশ বড়। সে করেছিল কূটনৈতিক যুদ্ধ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মিশরে একজন বাংলাদেশী কূটনীতিক কর্মকর্তা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তখনকার পাকিস্তানের দূতাবাসে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে কাজ করতেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানে বর্তমান বাংলাদেশের ফজলুল করিম।

১৮ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিব নগর সরকার গঠনের এক সপ্তাহের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের সরকারের আনুগত্য প্রকাশ করেন। তিনি নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন তারই সিনিয়র কর্মকর্তা আনোয়ারুল করিমের সাথে। প্রসঙ্গত বলে রাখি আনোয়ারুল করিম তৎকালীন পাকিস্তানের ওয়াশিংটন ডিসি দূতাবাসের কর্মকর্তা ছিলেন। তারই নেতৃত্ব ১৪ জন কূটনৈতিক একযোগে পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।

ফজলুল করিম একাই বাংলাদেশের পক্ষে কায়রো মিশন পরিচালনা শুরু করেন। তখন মিশরের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আনোয়ার সাদাত। কূটনৈতিক ফজলুল করিম মিশরের প্রেসিডেন্ট অফিসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ শুরু করেন। তারই ফলাফল হিসেবে আনোয়ার সাদাতের সাথে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়।

ফজলুল করিমের কাজগুলো কিন্তু সহজ ছিল না। তখন পাকিস্তানের সাথে মিশরের খুব মজবুত সামরিক যোগাযোগ ছিল। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আই এসআই এর খুব শক্তিশালী শাখা ছিল মিশরে। পাকিস্তান সরকার মিশর সরকারকে অনুরোধ করে ফজলুল করিমকে গ্রেফতার করে তাদের হাতে তুলে দিতে। কিন্তু মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত সরাসরি সে প্রস্তাব নাকচ করে ফজলুল করিমকে মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী কূটনৈতিক হিসেবে অনাপত্তি প্রকাশ করেন। এছাড়া তখনকার পুলিশ প্রধানকে ফজলুল করিমের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য হুকুম দেয়া হয়।

একটি কথা সব সময় আমরা বলি, যে সত্য কখনো গোপন থাকে না। আসলেও তা-ই। ১৯৭১ সালের তৎকালীন পাকিস্তান দূতাবাসের ঘটনাবলী বের করা খুবই কঠিন। তথ্যের মূল উৎসগুলো খুবই ক্লাসিফায়েড। দুর্ভাগ্যবশত ইতিহাসের অতল গহ্ববরে বেশির ভাগ তথ্যই হারিয়ে গেছে।

ফজলুল করিমের নাম প্রথম জানতে পারি হঠাৎ করেই। মিশরের জাতীয় তথ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কাজ করার সুবাদে মিশরের কেন্দ্রীয় মহাফেজখানাসহ বিভিন্ন সরকারী মন্ত্রণালয়ের পুরনো নথিপত্র দেখার সুযোগ হয়।

ইথিওপিয়ার সাথে মিশরের কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস নিয়ে একটি আর্টিক্যাল লিখতে গিয়ে মিশরের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের আর্কাইভ হলে গিয়েছিলাম। কাজ শেষ করে বের হবার সময় হঠাৎ একটি পুরনো বাঁধাইয়ের মলাটে চোখ আটকে যায়। বইটার শিরোনামটা ছিল ‘নন ক্লাসিফাইড ডকুমেন্ট, পাকিস্তান কনসুলেট: মিডিয়া আর্কাইভ ১৯৭১’ ।

সালটা দেখেই চোখ আটকে গেল। মারাত্মক কৌতূহলী হলাম। বইটা মূলত একটি নিউজপেপার এবং মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া নোটের অ্যালবাম। একজন মিশরীয় সহকর্মীর সাহায্য নিলাম আরবী সংবাদগুলোর পরিপূর্ণ পাঠোদ্ধারের। এরই মাঝে খুঁজে পেলাম একটি নোট। যাতে পাকিস্তান দূতাবাসের পক্ষ থেকে মিশরের সরকারকে অনুরোধ করা হয়েছিল যে তাদের প্রাক্তন কর্মকর্তা অমুসলিমদের সাথে হাত মিলিয়ে দেশের সাথে বেঈমানি করেছে। তাকে যাতে কোন অবস্থাতেই মিডিয়ার সামনে কথা বলতে দেয়া না হয়। নাম তার ফজলুল করিম।

তখনই বুঝলাম ফজলুল করিম হলো অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক যোদ্ধা। শুরু হলো ফজলুল করিম সম্পর্কে জানার চেষ্টা।

বর্তমানে কায়রোতে বাংলাদেশের দূতাবাস রয়েছে। আমি জানি না বর্তমান কর্মকর্তারা ফজলুল করিমকে চেনেন কিনা। দূতাবাস প্রাঙ্গণে ফজলুল করিমের একটি ছবি অন্তত থাক উচিত। কেননা তার মত কূটনৈতিক ‍মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বলেই বিশ্বজনমত পাকিস্তানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে গিয়েছিল।

Share.