ইন্টারনেটে তথ্যের মালিক কে, কে দেবে নিরাপত্তা?

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

ইন্টারনেটে ডাটা বা তথ্যের মালিক আসলে কে? ব্যক্তির নিজের তথ্য নিজের থাকছে তো? এমন প্রশ্ন উঠেছে সদ্য সমাপ্ত সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলনে। বক্তারা জানিয়েছেন, ব্যক্তির নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদির মালিক কি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, মোবাইলফোন অপারেটর নাকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সার্চইঞ্জিন বা ওয়েবপোর্টালগুলো? এগুলোর কোনোটাই এখনও ‘ডিফাইন’ নয়।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, এখন থেকেই এসব নিয়ে কথা বলতে হবে। আলোচনা করলে আগামীতে এসব উদ্ভূত প্রশ্নের জবাব মিলবে।

সম্প্রতি রাজধানীর লা মেরিডিয়ান হোটেলে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের টেলিযোগাযোগ সংস্থা এপিটি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের আয়োজনে তিন দিনব্যাপী (২৪-২৬ অক্টোবর) অষ্টম এপিটি সাইবার নিরাপত্তা ফোরাম’ অনুষ্ঠিত হয়। ফোরামের দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘হু ইজ দ্য ওনার অব ডাটা’ শীর্ষক কারিগরি অধিবেশন। ওই অধিবেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

ফোরামের এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘সাইবার সিকিউরিটি অন ডাটা ড্রাইভেন সোসাইটি’। বক্তারা প্রশ্ন করেন, আমরা ইয়াহু, গুগল বা ফেসবুকে লগইন করার সময় সব তথ্য তাদের দিয়ে দিচ্ছি। এসব ডাটার মালিক কি তারা না আমি বা আমরা? তারা কি এসব ডাটা বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করছে? তারা কি এসব করতে পারে?

বক্তারা বলেন, এসব নিয়ে কথা বলার সময় এসেছে। আইওটি (ইন্টারনেট অব থিংস)-এর যুগ চলে এলে জটিলতা আরও  বাড়বে। প্রতিটি ডিভাইস তথা গ্যাজেটস কানেক্টেড হচ্ছে ইন্টারনেটের সঙ্গে। ফলে এখন থেকেই ডাটা নিয়ে কথা না বললে একদিন এই ডাটাই (ব্যক্তিগত তথ্য) আমাদের বিপদে ফেলবে। তাই ডাটার নিরাপত্তা বা সুরক্ষাও খুবই জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিরাপত্তা বিশ্লেষক সুমন আহমেদ সাবির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ধরা যাক, আপনি মোবাইলফোন ব্যবহার করেন। তাহলে আপনার মোবাইল নম্বরের মালিক কে? আপনি নাকি অপারেটর? আপনি দাবি করবেন আপনার, আর অপারেটর দাবি করবে নম্বর তাদের। অন্যদিকে নম্বরটি নেওয়ার সময় আপনি যাবতীয় তথ্য তাদেরকে দিয়ে দিলেন। তাহলে এসব তথ্যের মালিক কে? এসব নির্দিষ্ট করতে হবে, ডিফাইন করতে হবে।’

এ সময় তিনি ব্যক্তির নিজস্ব তথ্য, প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য, রাষ্ট্রের তথ্য ইত্যাদির নিরাপত্তার বিষয়েও পৃথকভাবে জোর দেওয়ার আহ্বান জানান।

সুমন আহমেদ সাবির বলেন, ‘ফেসবুক, গুগলের কাছে ব্যক্তির নিজস্ব যেসব ডাটা চলে যাচ্ছে সেসবের যে অপব্যবহার হবে না তার নিশ্চয়তা কে দেবে? যদি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার হয় তাহলে কতদূর পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে, এর প্রভাব কী হতে পারে তা পর্যালোচনা করতে হবে। এসব হলে কী হবে তা হয়তো সবার জানা কিন্তু যেসব সমস্যা অনুমান করা যাচ্ছে তা যেন বিশালাকার ধারণ করতে না পারে সেজন্য বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন।’

সম্মেলনে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম নিরাপদ ইন্টারনেট নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘বর্তমানে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সাইবার অপরাধীরা দেশের ক্ষতি করে, সম্পদ বিনষ্ট করে। এদের সম্পর্কে আমাদের সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। সাইবার হুমকি একটা বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও ইস্যু। এটা আমাদের বৈশ্বিকভাবেই মোকাবিলা করতে হবে।’

বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ সাইবার আক্রমণ, এর ক্ষয়ক্ষতি, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি এবং এসব প্রতিরোধে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচন করেন।

জানা গেছে, নিরাপত্তা সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, কোরিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, ভুটান, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, টোঙ্গা, ভানুয়াতুসহ সদস্য দেশ, সহযোগী সদস্য দেশ, সম্পর্কযুক্ত সদস্য সংস্থা এবং অন্যান্য টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের অর্ধশতাধিক প্রতিনিধি অংশ নেন।

প্রতিনিধিরা বলেন, এই ফোরামে কথা বললে তা লিপিবদ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টিতে আসবে। ফেসবুক, গুগল, ইয়াহু, টুইটারসহ সবার কাছে বিশেষ বার্তা পৌঁছবে। সব মহল থেকে কথা উঠলে তা একটি নির্দিষ্ট পরিণতির দিকেও যাবে।

সম্মেলনে আইওটি, বিগ ডাটা, ক্লাউড এবং এর নিরাপত্তা, ডাটার মালিকানা, ডাটার নিরাপত্তা ও বিপণন এবং ক্রস বর্ডার ডাটা প্রবাহ নিয়ে আলোচনা হয়।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সম্প্রতি একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য ও সেবা বাসায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য একটি বিশেষ ডিভাইস ব্যবহার করার ঘোষণা দিয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী পণ্য বাসায় পৌঁছে দেওয়ার সময় তার হাতের ডিভাইস ক্রেতা বা গ্রাহকের বাসার দরজায় লকের কাছে ধরলে দরজা খুলে যাবে (যখন অর্ডারকারী বাসায় থাকবেন না)। বলা হচ্ছে, এখন আপনি কি আপনার বাসার নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাসওয়ার্ড ওই কোম্পানির হাতে তুলে দেবেন নাকি দেবেন না? দিলে একরকম সেবা, না দিলে আরেকরকম সেবা পাবেন। ফলে নিরাপত্তার দায়িত্ব আপনারও। কিন্তু এসব করতে গিয়ে আপনার যেসব তথ্য চলে যাচ্ছে সেসবের যে অপব্যবহার, বাণিজ্যিক ব্যবহার যে হবে না তা নিশ্চিত করার কোনও মাধ্যম এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। ফলে সময় এসেছে এসব নিয়ে কথা বলার।

Share.