ঝিলমিল ফ্ল্যাট প্রকল্পে পিপিপি’র নামে প্রতারণা: রাজউককে বেকায়দায় ফেলার ষড়যন্ত্র

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

কেরাণীগঞ্জে বিতর্কিত ‘ঝিলমিল’ প্রকল্পে প্রায় ১৪ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ হচ্ছে। এতে ব্যয় হবে ৮ হাজার কোটি টাকা। রাজধানীর দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার ওপাড়ে ব্যয়বহুল এ প্রকল্পের পুরো ব্যয় বহন করবে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ- রাজউক। বলা হচ্ছে, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে তথা পিপিপি’র মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। ঝিলমিল প্রকল্পে প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি কোনো অংশীদারিত্ব নেই। বিদেশি একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্পের কাজ দেয়া হয়েছে। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের একটি দালালচক্রের মাধ্যমে পূর্বনির্ধারিত মালয়েশিয়ান একটি কোম্পানিও রয়েছে। প্রকল্পে সব মিলিয়ে ৯১টি বহুতল ভবন নির্মাণ হবে। এর মধ্যে ২০তলা ১৪টি এবং ২৫তলাবিশিষ্ট ১৪টিসহ মোট ২৮টি ভবনে ১,৬০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট থাকবে ৪ হাজার ৬৩৪টি। এছাড়া ২০তলাবিশিষ্ট ৬৩টি ভবনে ১,৪০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট থাকবে ৯ হাজার ১৯৮টি। মোট ৯১টি বহুতল ভবনে ২ ধরনের ফ্ল্যাট হচ্ছে ১৩ হাজার ৮৩২টি। এ ভবন নির্মাণে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো ‘হাই রেট’ আদায় করে নিয়েছে রাজউক থেকে। প্রতি বর্গফুটে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে ৩ হাজার ৬৯৬ টাকা। ভ্যাট-ট্যাক্স এবং জমির মূল্য ছাড়াই এ রেট নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকল্পের জন্য যাবতীয় মালামাল আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করে নিয়েছে।
পিপিপি আইনে বলা আছে- সরকারি ও সেরকারি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও চুক্তি অনুযায়ী উভয়পক্ষ লাভ-ক্ষতির অংশীদার হবে। কিন্তু ঝিলমিল ফ্ল্যাট প্রকল্পের চুক্তিতে সেটা নেই। এ প্রকল্পের ১৬০ একর জমি রাজউকের। নির্মাণ কাজের পুরো অর্থও শোধ করবে রাজউক। এ প্রকল্পের চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজের মেয়াদ ৪ বছর। প্রথম দু’বছর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে কাজ করবে। তৃতীয় বছর রাজউক ৪০০ কোটি ও চতুর্থ বছর ৪০০ কোটি টাকা পরিশোধ করবে। এর পরের ৪ বছরে ৮ হাজার কোটির বাকি টাকা পরিশোধ করা হবে। এতে স্পষ্ট যে, নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারিত সময়ে তাদের সমুদয় টাকা রাজউক থেকে পেয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে কাজ শুরুর পর টাকা একটু বিলম্বে পাবে- এই যা। অবশ্য এ জন্য নির্মাতারা ব্যাংক রেটে সুদও যোগ করেছে নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে। এ কারণে ভবন নির্মাণ খরচও পড়ছে অনেক বেশি।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ অর্থাৎ পিপিপি আইনে বলা আছে, লাভ-ক্ষতি উভয়ই অর্থাৎ নির্দিষ্টহারে ঝুঁকিও বহন করতে হবে বেসরকারি বিনিয়োগকারীকে। অথচ এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ফ্ল্যাট বিক্রি না হলে নির্মাতারা কোনো দায় নিবে না। যেকোনোভাবেই হোক রাজউক ঠিকাদারদের পাওনা আট বছরের মধ্যে মিটিয়ে দিতে বাধ্য। কিন্তু বিশাল অংকের এ টাকা রাজউক কোথা থেকে যোগান দিবে তাও স্পষ্ট নয়। ব্যাংক ঋণ নিয়ে এই ঝিলমিল ফ্ল্যাট প্রকল্পের নির্মাণব্যয় পরিশোধ করা হলে রাজউকের বর্তমান কর্তৃপক্ষ ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের এ প্রতারণার দায় বহন করতে হবে সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটিকে। সে ক্ষেত্রে পরবর্তীতে যারা এর দায়িত্বে আসবেন তাদেকে পড়তে হবে বেকায়দায়। যা রাজউককে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছেন সরকারি এ দফতরটির বেশিরভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারী। রাজউকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঝিলমিল ফ্ল্যাট প্রকল্পকে কোনোভাবেই পার্টনারশিপের সংজ্ঞায় ফেলা যায় না। এদিকে, দেশে আর কোথাও কোনো পিপিপি প্রকল্প আছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে শীর্ষকাগজের এই প্রতিবেদককে রাজউকের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন- আছে বলে দাবি করেন। যদিও সুনির্দিষ্ট করে কোনো প্রকল্পের কথা জানাতে পরেননি তারা। সূত্র বলছে, দেশে বিনিয়োগে চরম হাহাকার অবস্থা চলছে। যে কারণে ফ্ল্যাট ব্যবসা মন্দা। দেশে বেসরকারি ডেভেলপার কোম্পানিগুলোর নির্মিত ৩০ হাজার ফ্ল্যাট বর্তমানে অবিক্রিত রয়েছে। গ্রাহক পাওয়া যাচ্ছে না। রাজউকের উত্তরা ফ্ল্যাট প্রকল্পে ১৫০০ ফ্ল্যাট গত ৬ বছরে ৮ বার বিজ্ঞপ্তি দিয়েও বিক্রি করা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর বাইরে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে হাই রেটে নির্মিত ঝিলমিল প্রকল্পের সফলতা নিয়ে সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর আগে, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নামে ভুয়া রিপোর্ট তৈরি করা হয়। যেখানে প্রকল্পের চাহিদা না থাকলেও লুট-পাটের জন্যই চাহিদা আছে বলে তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্মকর্তারা। এ নিয়ে প্রকল্পের শুরুতেই গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি শীর্ষকাগজের ১৪তম বর্ষের ১৫তম সংখ্যায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝিলমিল প্রকল্পের ফ্ল্যাটের চাহিদা থাকলে চুক্তি সইয়ের আগেই বিজ্ঞপ্তি দেয়ার কথা। কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে ঠিকাদারদের কার্যাদেশ প্রদান ও নভেম্বরে চুক্তি সইয়ের পরও ফ্ল্যাট বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দেয়নি রাজউক। কারণ, বিজ্ঞপ্তি দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কাক্সিক্ষত সাড়া না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে শুরুতেই প্রকল্পের ভুয়া চাহিদা রিপোর্টের গোমর যেমন ফাঁস হতে পারে। সেই সাথে প্রকল্পের অনুমোদন বাতিলের ভয়ও রয়েছে। এমনটি হলে লুট-পাটের সুযোগও হাতছাড়া হতে পারে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের। অপরদিকে চুক্তি অনুযায়ী, ঝিলমিল প্রকল্পে প্রতি বর্গফুট ভবন নির্মাণব্যয় ৩ হাজার ৬৯৬ টাকা। সেই সাথে প্রকল্পের জমির মূল্য, মসজিদ, হেলথ ক্লাব, সড়কসহ অন্যান্য সুবিধার নির্মাণব্যয়ের সার্ভিস চার্জ যুক্ত হবে। তারপরে রাজউকের লাভ। তবে প্রকল্প কর্মকর্তারা এ প্রসঙ্গে শীর্ষকাগজের এই প্রতিবেদককে বলেছেন, ভ্যাটছাড়া সব খরচ মিলিয়ে এ মুহূর্তে প্রতি বর্গফুটের দাম পড়বে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। আর সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্য অনুযায়ী এসব ফ্ল্যাটে গ্যাস সংযোগও থাকবে না।
রাজউক সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ান প্রতিষ্ঠান এবং তাদের দু’টি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গত ১৬ নভেম্বর রাজউকের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। ওই প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো- মালয়েশিয়ার বিনজি গ্লোবাল হোল্ডিংস এসডিএন বিএইচডি, চীনের জিয়াংশি কন্সট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (গ্রুপ) কোং লি: এবং বাংলাদেশর মাল্টিপেক্স হোল্ডিং লি:। এ জন্য টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও বাস্তবে সেটি ছিল আইওয়াশ। কারণ, মালয়েশিয়ান ওই প্রতিষ্ঠানকে যে কাজটি দেওয়া হবে আগেই দালাল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ঠিক করে রাখা হয়েছিল। রাজউক গত বছরের জানুয়ারিতে ‘ডেভেলপমেন্ট অব ঝিলমিল রেসিডেন্সিয়াল পার্ক’ প্রকল্পের জন্য দরপত্র প্রস্তাব আহ্বান করে।  লোক দেখানো ওই দরপত্রের পর গত বছরের ১৪ অক্টোবর ঠিকাদারী ৩ প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। পরে তাদের সঙ্গে চুক্তি করে রাজউক। সূত্রমতে, ৮ হাজার কোটি টাকা রাজউকের পুঁজি খাটানোর অবস্থা নেই। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েই নির্মাতাদের দায় পরিশোধ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট বিক্রি না হলে এই টাকার সুদ ও আসল টাকা ফেরত দিতে গিয়ে রাজউকের দেউলিয়া হতে হবে। অথচ দফতরটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুশ্চিন্তায় ফেলে মন্ত্রী এবং রাজউক চেয়ারম্যান এই অযৌক্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে নেমেছেন।

Share.