প্রশান্ত মহাসাগর অশান্ত হয়ে উঠছে

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দক্ষিণ চীন সাগরের উভয় তীরে ফিলিপাইন এবং ভিয়েতনামের অবস্থান। চীন জাপানের অবস্থান অনেক দূরে। কিন্তু দক্ষিণ চীন সাগরে নাকি খনিজ সম্পদে ভরপুর তাই সম্ভবতো চীনের দৃষ্টি দক্ষিণ চীনা সাগরের প্রতি। সেখানে তারা কৃত্রিম সৃষ্টি করে অবস্থান মজবুদ করার চেষ্টা করছে। অপরদিকে জাপানে দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জ স্পার্টলিতে শক্তিশালী সেনাঘাটি বানাচ্ছে।

দ্বীপটির মাঝে এরি মধ্যে জাপান শক্তিশালী অ্যান্টি মিসাইল ট্যাংক পাঠিয়েছে। এ ট্যাংক ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংস করতে সক্ষম। অন্যদিকে দ্বীপটির চর্তুরদিকে জাপানীরা সাতটি সেনা ঘাঁটি এবং তিনটি বিমান ঘাঁটি তৈরির প্রস্তুতি নিয়েছে। প্রাথমিকভাবে দ্বীপটিতে জাপান ৬০০ সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তি সমৃদ্ধ জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রও মোতায়েন করেছে।

বিতর্কিত এ দ্বীপাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে চীনই সর্বপ্রথম এ অঞ্চলের প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তোলে। জাপানের কোস্টগার্ডের সঙ্গে চীনা জেলেদের নিয়মিত সংঘাত হচ্ছে। চীনা তৎপরতার জবাব দেওয়ার জন্য জাপান পারমাণবিক সাব-মেরিন পাঠিয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা করেছে। জাপানের শিনজো আবে সরকার চীনের সাময়িক শক্তিকে পাল্লা দিতে সামরিক বাজেট বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নিয়েছে। জাপানের সামরিক বাজেট ১.৩৩% হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়েছে।

আবার এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন কমান্ডার অ্যাডমিরাল হারি হ্যারিস কংগ্রেসের এক শুনানীতে বলেছেন চীনের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বলেছেন, দক্ষিণ চীন সাগরে সুস্পষ্ট অধিকার বিস্তারের তৎপরায় চীন ব্যস্ত। কাজেই চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছ। সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক কমিটিকে বলেছেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তিনি অনুরূপ ভবিষ্যৎবাণী করছেন। তিনি আরো বলেছেন এখনই আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনকে যদি মোকাবেলা করা না হয় তবে ভবিষ্যতে মাঠ পর্যায়ের রণাঙ্গনে পিপলস্ আর্মির সঙ্গে পেরে উঠা কঠিন হবে। চীনকে হুশিয়ার করে তিনি বলেন, চীন আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক আচরণ করছে না।

উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের কারণে আমেরিকা উত্তর কোরিয়াকে মোকাবেলা করার জন্য এক পর্যায়ে ক্ষেপণাস্ত্রসমৃদ্ধ যুদ্ধ জাহাজ পাঠিয়েছিল। তা এখনও প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থান করছে। আমেরিকার তৎপরতাকে চীন তৃতীয় যুদ্ধের উস্কানী বলে উল্লেখ করেছিলো। রাশিয়াও এ তৎপরতায় তার সাব-মেরিন পাঠিয়েছিলো।

উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীন রাশিয়ার সীমান্ত রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে হাজার হাজার কোরিয়ান নাগরিক সীমান্ত অতিক্রম করে চীনে ঢুকে যাবে। রাশিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করাও বিচিত্র নয়। আপাতত দেখা যাচ্ছে চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়া ভিত্তিক একটা যুদ্ধ বলয় গড়ে উঠছে- আমেরিকার যে কোনো হুমকি মোকাবেলা করার জন্য। অপর পক্ষে, আমেরিকা, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মাঝে একটা শক্তিশালী মৈত্রী বন্ধন রয়েছে। এ বলয়ে অস্ট্রেলিয়াও থাকতে পারে। এখানে আরো উল্লেখ করা যায় ভারতের সঙ্গে ভিয়েতনামের সামরিক চুক্তি রয়েছে। ভারতও দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে মাঝে মধ্যে কথা বলার চেষ্টা করে।

আমেরিকা তার নৌশক্তির ৬০ শতাংশ আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে নিয়ে এসেছিল। মার্কিন বিমানবাহী রণতরী কার্ল ভিনসন এখন দক্ষিণ চীন সাগরে রয়েছে। কার্ল ভিনসনের অধিনায়ক বলেছেন, আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগরে রয়েছে এবং তারা তাদের অবস্থান দক্ষিণ চীন সাগর থেকে নড়াবে না।

চীন স্থল যুদ্ধে অতীতে খুবই পারদর্শীতা দেখিয়েছে। কিন্তু বিমান ও নৌযুদ্ধে এখনও আমেরিকার বিরুদ্ধে আধিপত্য বিস্তারের কোনো দক্ষতা দেখাতে পারেনি। নৌশক্তিতে আমেরিকা খুবই শক্তিশালী। তাদের কাছে বিমানবাহী ১০টি রণতরী রয়েছে যা আর কারো কাছে নেই। আধুনিক অস্ত্রেও আমেরিকা এখনও সুপিরিয়র। তবে বিভাজনে রাশিয়া চীনের পক্ষে রয়েছে। তার অস্ত্রের সুনিপুণতার খ্যাতিও কম নয়।

জাপান অস্ত্র তৈরিতে মনোযোগী হয়েছে। জাপান আধুনিক অস্ত্র তৈরি শুরু করলে সে বিশ্বকে চমক লাগাবে। উত্তর কোরিয়া জাপানের নিকটবর্তী দেশ। তার ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য জাপান কার্যকর অস্ত্র তৈরি করার কথা স্বীকার করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হলেও জাপানের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রশান্ত মহাসাগরে দীর্ঘদিন বজায় রেখেছিলো। ১৯০৫ সালে জাপান-রাশিয়ার যুদ্ধে জাপানের হাতে রাশিয়া পরাজিত হয়েছিলো।

আমেরিকা এবং ভারত চীনের বেল্ট এন্ড রোডের বিকল্প একটা পথ সৃষ্টির জন্য গোপন আঁতাত করছে এতে নাকি জাপান অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়াও যোগদান করছে। এটা প্রতিদ্বন্দ্বী স্প্রীড বিশ্ব যোগাযোগের ক্ষেত্রে উন্নত হবে। অনেক রাষ্ট্র উভয় উদ্যোগের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। পরস্পর পরস্পরের নির্মিত বন্দরগুলো ব্যবহার করার ব্যাপারে কোনো বাধা নিষেধ আরোপ না করলে দুনিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা এগিয়ে যাবে।

এশিয়া অঞ্চলে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকার খুবই ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ফিলিপাইনের সঙ্গে পুরনো সম্পর্ক থাকলেও মধ্যখানে তা নষ্ট হওয়ার পথে ছিলো। এখন আমেরিকা উদ্যোগ নিয়েছ ভুলবুঝাবুঝির অবসান ঘটাতে। ভিয়েতনামে আমেরিকা মূলধন বিনিয়োগ করেছে প্রচুর। প্যান-প্যাসিফিক এগ্রিমেন্ট কার্যকর হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা হতো ভাল। কিন্তু ট্রাম্প প্যানপ্যাসিফিক থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে নিয়ে সংস্থাটাকে অকার্যকর করে রেখেছে। শিনজো আবে বলেছেন আমেরিকার অংশ গ্রহণ ছাড়া প্যান-প্যাসিফিক কার্যকর হবে না।

বিশ্বায়ন ছিলো আমেরিকার উদ্যোগ। কিন্তু বিশ্বায়নে আমেকিার কোনো উপকার হয়নি তবে বিশ্বের অন্যান্য জাতি কমবেশী উপকৃত হয়েছে। ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এ স্লোগানের জন্য দাভোস সম্মেলনে বিশ্বনেতারা আমেরিকাকে তুলোধুনা করেছে। ট্রাম্পের আমেরিকা ফার্স্ট এ স্লোগান বিশ্বায়ন থেকে পিছু হটার উদ্যোগ। এখন বিশ্বে আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলার ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক কিছু রাষ্ট্র উদ্যোগ নিয়েছে নিজেদের মুদ্রা লেনদেন করবে। এতে আমেরিকার অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

শত দোষের পরেও আমেরিকা বিশ্বব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য এখনও বিরাট অনুদান প্রদান করে থাকে। কিন্তু বিশ্বের নব্য ধনীদের সে অভ্যাস নেই। শেষ পর্যন্ত এ কথা বলা যায় যে, আমেরিকা পড়ন্ত বেলা শুরু হলে বিশ্ব ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্থ হবে। বিশ্বব্যবস্থা ভেঙ্গে গেলে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হলেও বিশ্ব মুখ থুবড়ে পড়বে।

আনিস আলমগীর: শিক্ষক ও সাংবাদিক।
anisalamgir@gmail.com

Share.