রংপুর অঞ্চলে জামায়াতের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশের মতো রংপুর অঞ্চলেও রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী নিয়ে নানান হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। তবে চূড়ান্ত প্রার্থিতা অনেকটা নির্ভর করছে রংপুর অঞ্চলের জনপ্রিয় বলে দাবিদার জাতীয় পার্টি কোন জোটে যায় তার ওপর। রংপুর অঞ্চলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টি প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত না করলেও নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামী অনেকটা আগেভাগেই সুকৌশলে তাদের একটি প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আত্মগোপনে থাকা এক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন একটি তালিকাও পাওয়া গেছে। তবে জাতীয় পার্টির শক্ত অবস্থান হিসেবে পরিচিত রংপুরের কয়টি আসনে প্রার্থীর নাম প্রকাশ করেনি জামায়াতে ইসলামী।

অনেকেই মনে করছেন, জাতীয় পার্টি যদি একক নির্বাচন করে আর বিএনপি যদি জামায়াতকে সঙ্গে না নেয়, সে ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা করতেই দলটির এ অভিনব কৌশল। পাশাপাশি অতি গোপনে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগও একাধিক জরিপের মাধ্যমে রংপুর বিভাগের বেশ কয়েকটি আসনে প্রার্থী তালিকা তৈরি করেছে। তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে নির্বাচনী এলাকায় গণসংযোগ শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী তালিকায় যাদের নাম এসেছে তারা হলেন পঞ্চগড়-১. আব্দুল খালেক, পঞ্চগড়-২. শফিউল্লা শফি, ঠাকুরগাঁও-২. আবদুল হাকিম, ঠাকুরগাঁও-৩ আবুল কাশিম, দিনাজপুর-১. মোহাম্মদ হানিফ, দিনাজপুর-২. আফজালুল আনাম, দিনাজপুর-৩. মাহবুবুর রহমান, দিনাজপুর-৪. আফতাব উদ্দিন, দিনাজপুর-৫. আনোয়ার হোসেন, দিনাজপুর-৬. আনয়ারুল ইসলাম, নীলফামারী-১. আব্দুল হাকিম, নীলফামারী-২. মনিরুজ্জামান, নীলফামারী-৩. আজিজুল ইসলাম, নীলফামারী-৪. গোলাম মোস্তাকিম, লালমনিরহাট-১. হাবিবুর রহমান, লালমনিরহাট-২. আব্দুল বাতেন, লালমনিরহাট-৩. আজিজুর রহমান, রংপুর-১. আব্দুল গনি, রংপুর-২. এটিএম আজহারুল ইসলাম, রংপুর-৫. শাহ হাফিজুর রহমান, কুড়িগ্রাম-১. আজিজুর রহমান স্বপন, কুড়িগ্রাম-২. হাবিবুর রহমান, কুড়িগ্রাম-৩. আবদুল জলিল, কুড়িগ্রাম-৪. নূর আলম, গাইবান্ধা-১. আবদুল আজিজ, গাইবান্ধা-২. আব্দুল করিম, গাইবান্ধা-৩. নজরুল ইসলাম, গাইবান্ধা-৪. আবদুর রহিম, গাইবান্ধা-৫. ওয়ারেছ আলম দুদু।

তবে এ তালিকায় কিছুটা ভুল আছে, যা সময়মতো ঠিক করা হবে বলে দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামী থেকে লালমনিরহাট-১ আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় এক নেতা। তিনি বলেন, জামায়াতের প্রার্থী তালিকা তৈরি করা কঠিন কাজ। কেন্দ্রীয়ভাবে দলের কর্ম পরিষদের কয়েক দফা বৈঠক হবে। ওই বৈঠকে আসনভিত্তিক স্থানীয় দায়িত্বশীল নেতাদের নিয়ে ভোট হবে। ওই ভোটে বিজয়ী প্রার্থীর দলে তার অবস্থান ও অবদান মূল্যায়ন করতে একটি শূরা সদস্যের বোর্ড হবে। সব ফলাফল মিলে তারপর প্রার্থিতা চূড়ান্ত হবে।

জামায়াতে ইসলামীর আত্মগোপানে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সাংগঠনিকভাবে যতটা দুর্বল বলা হচ্ছে তারা ততটা দুর্বল হয়নি। গ্রেফতার ও মামলা এড়াতে তারা নিজেরাই আত্মগোপনে চলে গেলেও সাংগঠনিক কার্যক্রম তাদের থেমে নেই। তারা তাদের মতো দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সেই ক্ষেত্রে তারা বিশেষ কৌশল অবলম্বন করেছেন। যেসব সংসদীয় আসনে তাদের প্রার্থী শক্তিশালী সে সব আসনে তারা অতিগোপনে কাজ করছেন। স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে জেলা বা কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। তারা দলীয়ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও যদি বিএনপির সঙ্গে থাকেন তাহলে তারা ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে যাবেন। আর যদি বিএনপির সঙ্গে তাদের জোট না থাকে সেক্ষেত্রে তারা বিকল্প চিন্তা করবেন বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পার্টির সঙ্গে তাদের সমঝোতাও হতে পারে। তবে এ নিয়ে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি লালমনিরহাটে জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল নেতারা।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে তারা তাদের বিজয়ের জন্য সম্ভাব্য আসনগুলোতে দলীয় কার্যক্রম গোছাচ্ছে। লালমনিরহাট জেলায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক উপজেলা চেয়ারম্যানকেও সুকৌশলে ম্যানেজ করে তারা তাদের দলকে গোছাচ্ছে এমন গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে। রংপুর অঞ্চলের মধ্যে লালমনিরহাট ও নীলফামারীতে জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। ওই জেলা দুটিতে জামায়াতের শক্ত অবস্থানের আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী ও দলীয় কোন্দল রয়েছে। সেক্ষেত্রে মনোনয়ন বঞ্চিত হলে অনেক আওয়ামী লীগ প্রার্থী পর্দার আড়াল থেকে জামায়াতের প্রার্থীকে সহযোগিতা করবেন বলে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা মনে করেন। এ ছাড়া জামায়াত-শিবিরের অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগের কমিটিতে ঢুকে গেছেন বলে দাবি করেন গোয়েন্দা সংস্থাটির ওই কর্মকর্তা।

এদিকে গত বন্যায় ও চলিত শীতে ছিন্নমূল মানুষের মাঝে বিভিন্ন কৌশলে ত্রাণ ও শীতবস্ত্র বিতরণ করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে দলটি।

এদিকে একটি সূত্র মতে, প্রার্থীর চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে মাঠের বিরোধী দল বিএনপিও। ২০০৮ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে যেসব শরিক দলের প্রার্থীরা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন এমন কয়েকজনকেও ছাড় দেয়ার চিন্তা আছে বিএনপিতে। তখনকার ফলাফলে জামায়াতে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-১ ও ৬, নীলফামারী-২ ও ৩, লালমনিরহাট-১, রংপুর-১ ও ২, গাইবান্ধা-১, ৩ ও ৪ আসন।

ওই আসনগুলো এবারো জামায়াতে ইসলামীকে দেয়া হতে পারে। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক উপমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু এ অঞ্চলে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করছেন। এরই মধ্যে তিনি প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন দলের হাইকমান্ডের সঙ্গে। বিশেষ করে বিভিন্ন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দলের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীর তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন। এ ছাড়া অনেক প্রার্থী লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও যোগাযোগ করছেন বলে জানা গেছে। তবে বিএনপি এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করতে না পারলেও প্রতিটি আসন থেকে ৩ জন করে সম্ভব্য প্রার্থীর নাম দিয়ে একটি গোপন খসড়া তালিকা তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে।

লালমনিরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অ্যাড. আব্দুল বাতেন বলেন, শত বাধা, মামলা ও হামলার পরও আমরা আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। দেশের সাধারণ মানুষ আমাদের সঙ্গে আছে। আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব সেই প্রত্যাশায় আমাদের প্রার্থী ও দলীয় লোকজন মাঠে কাজ করছেন। কার সঙ্গে ও কিভাবে নির্বাচনে অংশ নেব তা বলার সময় এখনো আসেনি।

লালমনিরহাট জেলা জাতীয় পার্টির যুগ্ম সম্পাদক রোকন উদ্দিন বাবুল বলেন, দলের চেয়ারম্যান ইতোমধ্যে বলে দিয়েছেন জাতীয় পার্টি এককভাবে নির্বাচন করবেন। জাতীয় পার্টি লালমনিরহাটের ৩টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা দিয়েছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা এলাকায় কাজ করছেন।

লালমনিরহাট জেলা আওয়ামী লীগের সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান বলেন, জামায়াতের সাংগঠনিক কোনো অবস্থান নেই। তাদের বিএনপি ছাড়া দেশের সাধারণ মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনমুখী দল। সঠিক সময় আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতেই বিভিন্ন জরিপের ভিত্তিতে ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন দেবেন।

মানবকণ্ঠ

Share.