সর্বজনীন শিক্ষা, দর্শন, পুঁজিবাদ ও রাজনীতির সাতকাহন

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

স্থান, কাল এবং সমাজভেদে শিক্ষাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ইংরেজি Education কথাটির মূল ল্যাটিন অর্থ হলো ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনাকে অগ্রসর করে নেয়া। আর বাংলায় শিক্ষা শব্দটি এসেছে ‍’শাস’ ধাতু থেকে। যার অর্থ শাসন করা বা উপদেশ দান করা। মনীষীগণ নানাভাবে শিক্ষার সংজ্ঞা দিয়েছেন।যেমন, সক্রেটিসের ভাষায় “শিক্ষা হল মিথ্যার অপনোদন ও সত্যের বিকাশ।” এরিস্টটল বলেন “সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করাই হল শিক্ষা”। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায় “শিক্ষা হল তাই যা আমাদের কেবল তথ্য পরিবেশনই করে না বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।”।

শিক্ষার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির অন্তর্নিহিত গুণাবলির পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য উৎসাহ দেয়া হয় এবং সমাজের একজন উৎপাদনশীল সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠালাভের জন্য যে সকল দক্ষতা প্রয়োজন সেগুলো অর্জনে সহায়তা করা হয়। সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। তবে শিক্ষা হলো সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশসাধনের অব্যাহত অনুশীলন। আর দর্শন মানে মানুষের জগৎকে দেখার, জগতের মধ্যে সমষ্টি, ব্যক্তি ও সমষ্টিকে স্থাপন করবার দৃষ্টিভঙ্গি। দর্শন সেই জ্ঞান যা অস্তিত্ব এবং বাস্তবতার রহস্য উন্মোচন করতে চায়। এটি সত্য ও জ্ঞানের স্বরূপ উদ্ঘাটন করার সাথে জীবনের জন্য যা কিছু মূল্যবান এবং গুরুত্বপূর্ণ তার অনুসন্ধান করে। ব্যক্তি ও সমাজের ভিতরকার সম্পর্ককে দর্শন পর্যবেক্ষণ করে। এর উদ্ভব মানুষের বিস্ময়, কৌতুহল এবং জানা ও বোঝার বাসনার মধ্যে। দর্শন তাই এক ধরনের অনুসন্ধিৎসা পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, সমালোচনা এবং ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি। শিক্ষা, দর্শন, পুঁজিবাদ ও রাজনীতির সম্পর্ক সুপ্রাচীনকাল থেকেই সমান্তরাল পথে নয়, সুকৌশলে বক্র পথে অগ্রসরমান।

অথচ আধিপত্য, কূপমণ্ডূকতা, বৈষম্যকে প্রশ্ন করেই শিক্ষা অগ্রসর হয়। যে কালে জ্ঞানচর্চার শৃঙ্গে অবস্থানকারী ব্যক্তিরা মনে করেন দাসপ্রথা প্রাকৃতিক এবং বিদ্যাচর্চার জন্য অবশ্যম্ভাবী সেকালে কিংবা সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে সর্বজনীন শিক্ষার প্রশ্ন অবান্তর এমনকি হাস্যকার একটি বিষয়। যেকালে বা যে-সমাজে ধরে নেয়া হয় জগতে কিছু মানুষ সর্ব অধীশ্বর, ঈশ্বরের প্রতিনিধি আর বাদবাকি সবাই তার বা তাদের অধিনস্থ, যেখানে সেই কিছু মানুষকে রাজা সম্রাট বা ধর্মনেতা হিসেবে সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখা হয়, যেখানে ধর্ম এবং রাষ্ট্রক্ষমতা একাকার হয়ে ঐশ্বরিক মর্যাদা লাভ করে এবং তার যেকোনো বিরোধিতা একইসঙ্গে রাষ্ট্রদোহী ও ধর্মদ্রোহী হিসেবে অভিহিত হয়, সেখানেই শিক্ষার সর্বজনীনতা চিন্তা হিসেবেও উপস্থিত হওয়া কঠিন। এ ধরনের সমাজ,রাষ্ট্র এবং তার শিক্ষা সম্পর্কিত চিন্তা প্রাচ্য ও প্রতীচ্য দু’অঞ্চলেই গত কয়েক হাজার বছরে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ণপ্রথা দ্বারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে শিক্ষা থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

তারপরও একলব্যের মতো যারা মেধার স্বাক্ষর রাখতে চেষ্টা করেছেন তাদের বুড়ো আঙ্গুল কেটে কিংবা নির্বাসনে পাঠিয়ে কিংবা একঘরে করে উচিত ‘শিক্ষা’ দেয়া হয়েছে।এককালে গুরু ‘শিষ্য’ আশ্রম শিক্ষা কিংবা টোল শিক্ষা প্রচলিত ছিল, কিন্তু তা প্রযোজ্য ছিল খুবই সংখ্যালঘু মানুষের মধ্যে। যে অঞ্চলে বর্ণপ্রথা বিরোধিতা করে শিক্ষার মহিমা সর্বজনীন করার লক্ষ্যে নালন্দা, তক্ষশীলা বা ময়নামতির মতো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল সেখানেই সংখাগরিষ্ঠ মানুষ নিম্নবর্ণে জন্মগ্রহণের অপরাধে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলো দীর্ঘকাল।কিন্তু বর্তমান সময় রাজা বাদশার যুগ নয়। গির্জা বা অন্য কোনো ধর্মপ্রতিষ্ঠানের ঐশ্বরিক আবহে রাজনৈতিক ক্ষমতা চর্চার পরিসরও অনেকটাই সংকুচিত। বর্তমানকালকে গণতন্ত্রের কাল, ধর্মনিরপেক্ষতার কাল বা অসাম্প্রদায়িকতার কাল বলে ধরা যায়।এখন দাসপ্রথা,রাজতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র, অভিজাতন্ত্র সাধারণভাবে মহিমান্বিত নয়। সকলের সমান অধিকার, সকলের অংশগ্রহণ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-লিঙ্গ নির্বিশেষে সকলের অবস্থানগত সমতা বর্তমানে আনুষ্ঠানিকভাবে তথা আইনগতভাবে স্বীকৃত।

সর্বজনীন শিক্ষা একটি সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে ঊনিশ শতকে হতেই ক্রমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়েছে।ব্যক্তিক থেকে সামষ্টিক, অপ্রাতিষ্ঠানিক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দাঁড়িয়েছে। তাই বর্তমানে শিক্ষা ক্ষেত্রে সুযোগের কোনো বৈষম্য থাকার কথা নয়।গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে যে ধারণা ক্রমশ শক্তিশালী হয়েছে তা জোরদার শুরু ফরাসি বিপ্লবের সময়ে—সাম্য মৈত্রী আর স্বাধীনতার জোড়ালো আওয়াজ দিয়ে। ধরে নেয়া হয়েছিল যে, গির্জা রাজশাসন অভিজাততন্ত্র উৎখাতের মধ্যদিয়ে এমন একটি ব্যবস্থা স্থাপন সম্ভব হবে যা সবার জন্য সমান সুযোগের অধিকার সুনিশ্চিত করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ফরাসি বিপ্লব উত্তর-পশ্চিম সমাজে ব্যক্তি মালিকানা ও ব্যক্তি স্বাধীনতা মহিমান্বিত করা হয় গণতন্ত্র স্বাধীনতার প্রকাশ হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় এসব সমাজে অধিকাংশ মানুষ সম্পত্তিহীন এবং স্বাধীনতার একটি শুস্ক খোসার চাইতে অধিক উপস্থিতি তাদের জীবনে নেই। দেশের অধিকাংশে সম্পদ ও সুযোগ খুব অল্পসংখক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত। এখানে রাষ্ট্র সদা হেলে থাকে সেই সম্পত্তি মালিকদের দিকে। এই সমাজে বৃহৎ ব্যবসা, মুনাফা ও বাজারমুখিতাই অধিপতি দর্শন। এখানে আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা নেই, কিন্তু প্রবেশ নিষেধের সুকৌল রয়েছে। এখানে ঈশ্বর হলো পুঁজি। আর এই ব্যবস্থার নাম পুজিবাদ, যার রাজনৈতিক, মতাদর্শিক এবং সহিংস চেহারা আড়ালে একে ডাকা হয় ‘বাজার অর্থ নীতি’ বলে বা আরেকটু এগিয়ে বলা হয় ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’। এই ব্যবস্তার শুরু রেঁনেসা বা নবজাগরণের উদ্ভবকারী ইউরোপেই।

অথচ মানবতাবাদ ইউরোপীয় রেঁনেসার এক অন্যতম প্রধান অবদান।রেঁনেসার মূলকথা মানবতার জয়গান।মানুষের অমিতশৌর্য, কর্মক্ষমতা, প্রকৃতির উপর তার বিজয় ঘোষণা।পনেরশ শতকের শেষভাগেইউরোপীয় রেনেসাঁর শুরু ইতালিতে। ক্রমবিকাশের ধারায় পরবর্তী চারশ বছর ধরে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ইউরোপে। ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগে ফরাসি এবং দক্ষিণ জার্মানিতে, শেষভাগে ভেনিসে। সতের শতকের শুরুতে ইংল্যান্ডে এবং শেষভাগে হল্যান্ডে। ঊনিশ শতকের ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব এর চুড়ান্ত বিকাশ বলে ধরে নেয়া চলে।রেনেসাঁর ফলে শিল্প ও সাহিত্যে সূচিত হয় বিপ্লব, যার ফলশ্রুতিতে নতুন চিত্রকল্প, রূপকল্প, নতুন মূল্যবোধের উন্মেষ ঘটে। রেনেসাঁর অগ্নিপুরুষ শিল্পী, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্জিই প্রথম শব-ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে শারীরতত্ত্বের নতুন দিকের সূচনা করেন। এর ফলে শরীরের প্রকৃত গঠন পাঠে বিজ্ঞান চিন্তায় শুধু বিপ্লব আসেনি বিপ্লব ঘটেছে শিল্পক্ষেত্রেও। কিন্তু পুঁজিবাদের অবৈদ সন্তান ঔপনিবেশিকতা মানবতাবাদের এ দর্শনকে ভূলুণ্ঠিত করে। আধিপত্য আর দখলপর্বের সর্বশেষ রূপায়ন হলো পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন।বাংলাদেশ এই পুঁজিবাদী বিশ্বব্যাবস্থার প্রান্তে অবস্থানকারী একটি মধ্যম আয়ের দেশ।

এসব দেশের সাধারণ মানুষ পুঁজিবাদের বিকাশ হওয়া ও না হওয়া দুটোরই শিকার। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার দিকে তাকালে বৈষম্য আর বঞ্চনাই প্রধান হয়ে উঠে এবং একটু গভীর বিশ্লেষণেই শুধুমাত্র শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস নয়, দেখি তার মধ্যে অন্তর্গত সন্ত্রাস। কারণ পাওলো ফ্রেইরির ভাষায় , সবরকম আধিপত্য,শোষণ, নিপীড়নমূলক সম্পর্ক অন্তর্গতভাবেই সহিংস, সেই সহিংসতা প্রকট চেহারায় প্রকাশিত হোক বা না হোক। সেই ধরনের সম্পর্কের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকারী এবং আধিপত্যের শিকার দুপক্ষই পরিণত হয় বস্তুতে। প্রথম পক্ষরা ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহারের মধ্যদিয়ে অমানবিকীকৃত হয়, দ্বিতীয় পক্ষরা হয় তার অভাব জনিত কারণে।এর আংশিক চিত্র সরকারি দলিলেই বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জাতীয় শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট ২০০৩(মার্চ ২০০৪) –এ বলা হয়েছে যে,‘বর্তমান দেশে ১১ ধরনের পূর্নাঙ্গ প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। এগুলো হচ্ছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি বিদ্যালয়, আনরেজিস্টার্ড বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ মাদ্রাসা সংলগ্ন এবতেদায়ী মাদ্রাসা,পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়, স্যাটেলাইট বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন স্কুল, এনজিও পরিচালিত পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক বিদ্যালয়।’

আরো বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্কুলের শতকরা প্রায় ৯৮ টি বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। সরকারি বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৬১৬৬টি।এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র ৮৮৫০-টিতে ল্যাবরেটরি আছে, গ্রন্থাগার আছে ৭৮০-টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। কোনো মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো পদ সৃষ্টি হয়নি।

আরও বলা হয়েছে যে, ইংরেজি,গণিত ও বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ করা হয় না। শিক্ষকদের মধ্যে আনুমানিক মাত্র ৪৩৫ জনপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, প্রায় ১ লক্ষ শিক্ষকের কোনো প্রশিক্ষণ নাই।উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত যাত্রা এ দেশের অধিকাংশ মানুষের জন্য এক দুর্গম পথের কাহিনী। প্রান্তিক মানুষের জন্য শিক্ষার্জন আজও প্রায় এক আজব বিলাসিতা। ভর্তি বাণিজ্য, প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস,রাজনৈতিক অস্থিরতাসহ নানা নানা ধরনের আন্দোলন আন্দোলিত করে খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সন্তানকে শিক্ষিত করার স্বপ্নসাধ। একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে এগিয়ে নেয়ার কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষার অগ্রগতির প্রশ্নে যে কোনো মূল্যেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুশিক্ষা অর্জনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পুঁজিবাদী মতাদর্শ সর্বজনীন শিক্ষার পরিবেশকে বিঘ্নিত করে।তাই সাধারণ মানুষের কথা চিন্তা করে,আগামীর একটা সুন্দর প্রজম্মের প্রত্যাশায় সর্বজনীন শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি।এটা পরিলক্ষিত হয় যে, নানা কারণে মাঝেমধ্যেই দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অস্থির হয়ে ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, যদি শিক্ষা অর্জনের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে অস্থিরতা বিরাজ করে তবে সামগ্রিক অর্থেই নেতিবাচক।

Share.