কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে এমডির অসৌজন্য আচরণ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দলের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছেন বিশেষায়িত ব্যাংক আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জালাল উদ্দিন আহমেদ। সুনির্দিষ্ট কিছু অভিযোগের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল ওই ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গেলে এমডি তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেননি। পরিদর্শক দলের চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করেননি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত। উল্টো তাদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করেছেন। তদন্তের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে করণীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারিশও তিনি আমলে নেননি। ব্যাংকে পদোন্নতিসহ প্রশাসনিক কাজে কোনো বিধি মেনে চলা হচ্ছে না। পর্ষদের বৈঠক হচ্ছে না ১ বছর ৮ মাস ধরে। বেআইনিভাবে নির্বাহী কমিটি দিয়ে ব্যাংক পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ হয়ে পড়েছে অরক্ষিত।

আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তৈরি এক তদন্ত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে সচিব ও আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে। এতে ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ এবং ব্যাংক পরিচালনায় প্রচলিত বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়ে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো পরিদর্শক দল পরিদর্শনের কাজে যে কোনো ব্যাংকে গেলে তারা প্রধান কার্যালয়ের একটি চিঠি নিয়ে যায়। যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর পর্যন্ত অনুমোদিত হয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) স্বাক্ষর করেন। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী ওই চিঠি দেখানোর পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এমডি তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে বাধ্য। সহযোগিতা না করা অপরাধ বা অসৌজন্যমূলক আচরণের মধ্যে পড়বে। পরিদর্শক দলের কর্মকর্তারা এ ধরনের অভিযোগ করলে সংশ্লিষ্ট এমডির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ ছাড়া পরিদর্শক দল তদন্তের স্বার্থে তাৎক্ষণিকভাবে যদি এমডিকে কোনো পরামর্শ দেয় তিনি সেটি পরিপালন করতে বাধ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মোস্তফা আনোয়ারের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে দেখেন তিনি ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান। তাকে ওই পদে রেখে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে না বিধায় ওই পদ থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু এমডি তা করেননি। তিনি পরিদর্শক দলকে বলেছেন, ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক তাদের সহায়তা করবে বলে তদন্ত কাজে কোনো সমস্যা হবে না। এ ছাড়া অভিযুক্ত কর্মকর্তা মোস্তফা আনোয়ার সম্পর্কে ব্যাংক থেকে যে লিখিত জবাব দেওয়া হয়েছে সেগুলোও পক্ষপাতদুষ্ট। যে কারণে তাদের ওই বক্তব্য বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রহণ করেনি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে ভিন্ন রকম তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকের সচিব পদটি উপমহাব্যবস্থাক (ডিজিএম) পদমর্যাদার। ব্যাংকে এ পদের কর্মকর্তা থাকার পরেও সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এজিএম মোস্তফা আনোয়ারকে। ব্যাংক কর্মকর্তারা পরিদর্শক দলকে অফিসিয়ালি বলেছেন, ডিজিএম মাহবুবুর রহমান সচিব পদের দায়িত্ব নিতে চাননি এবং অন্য কোনো যোগ্য কর্মকর্তা না থাকায় তাকে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে মাহবুবুর রহমানকে যে সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সে মর্মে ব্যাংকের ফাইলে কোনো নথি পাওয়া যায়নি। সচিব পদটি পর্ষদের অধীনে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ও পর্ষদের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করেন সচিব। এ পদে নিয়োগ দিতে পর্ষদের অনুমোদন লাগবে। কিন্তু মোস্তফা আনোয়ারকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে পর্ষদের কোনো অনুমোদন নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ আমাদের সময়কে বলেন, যে ক্ষমতা বলে বাংলাদেশ ব্যাংক আনসার-ভিডিপি ব্যাংকে তদন্ত করেছে, ওই ক্ষমতা বলেই তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। তিনি আরও বলেন, এর আগেও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে তারা ব্যবস্থা না নিলেও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের কর্মকর্তাদের ৩০টি বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন ব্যাংকের গোপনীয় নথির ভা-ার থেকে হারিয়ে গেছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধ। ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকের ভল্টের যেমন বিশেষ নিরাপত্তা থাকে, তেমনি ব্যাংকের গোপনীয় নথিরও বিশেষ নিরাপত্তা দিতে হয়।

এতে বলা হয়, পদোন্নতিপ্রাপ্ত পদে ৬ মাস সন্তোষজনক কার্যকাল শেষ হওয়ার পর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তথা বিভাগীয় মামলা না থাকা সত্ত্বেও নানা অজুহাতে বছরের পর বছর আটকে রাখা, চাকরিকাল গণনা, পদোন্নতি বিবেচনা করা, পদোন্নতির পর জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার চেয়ে ব্যক্তি বিশেষের ইচ্ছা অনিচ্ছা প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে ব্যাংকটির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নীতিমালা না মেনে পাশ কাটিয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছার ভিত্তিতে এখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। যা প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ব্যাংকটিতে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরির আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর দায় এমডি এড়াতে পারেন না।

এ বিষয়ে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জালাল উদ্দিন আহমেদ আমাদের সময়কে বলেন, আমি শুনেছি মোস্তফা আনোয়ারের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করছেন। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করেছে তা আমি আসার আগের অভিযোগ।

অভিযোগ ওঠার পরও এখনো কীভাবে মোস্তফা আনোয়ার ব্যাংকে কর্মরত আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক তদন্ত করে কী তথ্য পেয়েছে তা আমাদের এখনো জানায়নি। তাই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

সচিব পদে তার নিয়োগ নিয়ে তিনি বলেন, এটি ব্যাংকের পর্ষদের সিদ্ধান্ত। পদ নিয়ে বোর্ড যে সিদ্ধান্ত নেবে তাই চূড়ান্ত। তাই এই বিষয়ে বলার কিছু নেই।

এ বিষয়ে পর্ষদের অনুমোদনের নেই বলে তাকে জানালে তিনি বলেন, পর্ষদ মৌখিকভাবে এ সিন্ধান্ত দিয়েছে।

এদিকে অভিযোগের বিষয় জানতে চেয়ে মোস্তফা আনোয়ারের নিজস্ব মোবাইল ফোন নম্বরে ও অফিসের টিঅ্যান্ডটি ল্যান্ডফোনে বারবার চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। ফোনে না পাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালনক জালাল উদ্দিন বলেন, ব্যাংক একটি কনফারেন্সের আয়োজন করছে। তাই নিয়ে আমরা সবাই ব্যস্ত। তিনিও হয়তো ব্যস্ত। তাই তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।

উল্লেখ্য, আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক সরকার নিয়ন্ত্রিত একটি বিশেষায়িত ব্যাংক। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক আইন ১৯৯৫-এর অধীনে এবং এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। বাংলাদেশ আনসার এবং গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের আর্থিক সেবা প্রদানই এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য।

উৎসঃ   আামদের সময়
Share.