[শিল্প-সাহিত্য] সাহিত্যের দুই দিকপাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হাইনরিশ হাইনে

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

একজন বাঙালির কাছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই সময়ে সাহিত্য ও জীবনের প্রতীক। আর একজন জার্মানের কাছে হাইনরিশ হাইনে ছিলেন ‘রোমান্টিক যুগের’ প্রেম ও সুন্দরের কবি। এখানে রোমান্টি যুগ বলতে ইউরোপের রেনেসাঁ আন্দোলনের ঠিক পরবর্তী সময়টাকে বোঝায়। রোমান্টিক একটি সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক যুগ যা মূলত ১৮ শতাব্দীর প্রথমার্ধে (১৭৯০ থেকে ১৮৫০) জার্মানিতে তথা ইউরোপে একাধারে শিল্পবিপ্লব ও রোমান্টিক সাহিত্য-শিল্প চর্চার উন্মেষ ঘটায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম (১৮৬১) অর্থাৎ ইউরোপের রেনেসাঁ আন্দোলনের অনেক পরে হলেও ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক যুগান্তকারী সময়গুলোকে তিনি তার লেখায় বিশেষভাবে চিহ্নিত করে বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি  সমাজ ও সংস্কৃতির মানবিক মূল্যবোধের একত্রীকরণের আদর্শ উপস্থাপন করে সাহিত্যে এক নতুন ধারার প্রতিফলিত ঘটান।
আর ‘রোমান্টিক যুগ’ ইউরোপীয় সাহিত্যের সৃজনশীল বুদ্ধিদীপ্ত এবং রচনাশৈলীর এক যুগান্তকারী সময় যখন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিতে ১৮ শতকের প্রথম থেকেই শুরু হয়।
রেনেসাঁ যেমন গ্রিক ও লাতিন ধ্রুপদী সাহিত্যের পুনরুদ্ধার তথা খ্রিস্টীয় ধর্মশাস্ত্রের নবতর ব্যাখ্যার প্রয়োজনে সেখানে নিয়ে আসে এক পরিপূর্ণ সংস্কার ও নবজাগরণ, তেমনি বাংলায় পাশ্চাত্য সভ্যতাই চমকিত করেছিল প্রাচ্যকে তাকে উজ্জীবিত করেছিল এক নতুন জীবনে; চালিত করেছিল এক অত্যাশ্চর্য পুনর্জাগরণের পথে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়াও সেই পুনর্জাগরণে আরো যাদের নাম অবশ্যই বলতে হয় তারা ছিলেন রবীন্দ্রনাথের পূর্বসূরি বঙ্কিমচন্দ্র, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, দীনবন্ধু মিত্র ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া সকলেই ছিলেন ইউরোপীয় রেনেসাঁর সমসাময়িক যুগের কবি-সাহিত্যিক (১৭৫০ থেকে ১৮৫০)।
জার্মান কবি হাইনরিশ হাইনের (জন্ম : ১৩ ডিসেম্বর ১৭৯৭ মৃত্যু : ১৮৫৬), সাথে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মের কম্পারেটিভ (তুলনামূলক) আলোচনা একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ বটে। হাইনের মৃত্যুর ৫ বছর পরে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়, এই দুজন মহাপুরুষকে এক করে দেখবার কোনো সুযোগ নেই, তবুও কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
জার্মান  ‘রোমান্টিক যুগের’ কবি হাইনরিশ হাইনে যখন ‘মাত্র’ ৩৫০টি কবিতা রচনা করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন ঠিক তার পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৩৫০০ এর বেশি কবিতা ও গান লিখে প্রেম, ঐশ্বরিক পূজা ও প্রকৃতির কবি হয়ে বাংলা সাহিত্যে একটা বিরাট অংশজুড়ে আসন গেড়েছেন। এর প্রকৃত কারণ হলো, হাইনরিশ হাইনে একা ছিলেন না, তার সময়োপযোগী রোমান্টিক যুগের আরো অন্যান্য কবি সাহিত্যিক যেমন নোভালিস, প্রিন্স হার্ডেনবার্গ, হাইনরিখ ফোন ক্লাইস্ট, আইসেনডর্ফ, হফম্যান, বেটিনা ফোন অর্নিম তাদের সাথে একত্র হয়েই রোমান্টিসিজম এর চর্চা করেছেন আর রবীন্দ্রনাথ বলতে গেলে প্রায় একাই বাংলা সাহিত্যে একটা বিরাট সময়জুড়ে মানুষের মনোজগতে জায়গা করে নিয়েছেন। কাজেকাজেই এই দু’জন কবির সাহিত্যকর্মের ক্ষেত্র ও প্রকাশ আলাদা, মিলটা শুধু মানুষের গ্রহণযোগ্যতায়। রবীন্দ্রনাথ তার সাহিত্য সৃষ্টির পুরো কীর্তিটাই (নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পূর্ব অবদি) ভারতবর্ষেই পেয়েছেন, অন্যদিকে হাইনরিশ হাইনে সে সময় বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেন তার ধর্মসমালোচনায় ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কট্টর সমালোচক হিসেবে। এমনকি হাইনে জন্মগতভাবে ইহুদি হয়েও খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্মের সমালোচনায় ছাড় দেননি। সেই অপরাধেই একসময় তাকে জার্মানি ছেড়ে প্যারিসে রাজনৈতিক আশ্রয় নিতে হয়েছিল।
আর দুজন জার্মান সাহিত্যের দিক্পালের নাম না উল্লেখ করলে জার্মান সাহিত্যালোচনা অসমাপ্ত থাকে তারা হলেন গোয়েথে ও শিলার তারা দুজনেই ছিলেন রেনেসাঁ ও রোমান্টিক যুগের লেখক, তাদের দুজনেরই লেখার পর্যালোচনা রবীন্দ্রনাথ বাংলায় করেছেন, গোয়েথে ফাউস্ট নাটকের একটা বিরাট অংশই তিনি অনুবাদ করেছেন,  আর হাইনরিক হাইনের  কবিতার বঙ্গানুবাদও করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জার্মান সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ জাগার কারণ হলো তার পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর,  ব্যবসায়িক কারণে প্রিন্স দ্বারকানাথ ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও জার্মানিতে সফর করেন ও বেশ লম্বা সময় জার্মানিতে কাটান ও জার্মান লেখকদের বই পুস্তক  (মূল  জার্মান ভাষায়)  ঠাকুর পরিবারের লাইব্রেরির সংগ্রশালায় রাখেন। কথিত আছে  রবীন্দ্রনাথ যখন ১৭ বছর বয়স তখন তিনি জার্মান ভাষা শেখা শুরু করেন এবং ১৮৭৮ সালে ভারতী পত্রিকায়  তিনি গোয়েথের ‘ফাউস্ট’ এর লিটারেচার ক্রিটিক লেখেন যা তিনি ফাউস্ট এর জার্মান ভার্সন পড়েই আর্টিকেলটি লেখেন। এখনো রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে সেই ফাউস্ট বইটি সংরক্ষিত আছে যেখানে তিনি নিজ হাতে বিশেষ বিশেষ লাইনগুলো মার্ক করেছিলেন।  পরবর্তীতে জার্মান রোমান্টিক কবি হাইনরিশ হাইনের কবিতার প্রতি তার আগ্রহ বাড়ে।
যেমন,  হাইনরিশ হাইনের প্রেমের কবিতার রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ –
‘নীল বায়লেট নয়ন দুটি করিতেছে ঢলঢল
রাঙা গোলাপ গাল দুখানি, সুধায় মাখা সুকোমল।
শুভ্র বিমল করকমল ফুটে আছে চিরদিন!
হৃদয়টুকু শুষ্ক শুধু পাষাণসম সুকঠিন!’
মোনাজ হক, সম্পাদক এশিয়া টুডে
www.asiatoday.fr

Share.