শবে বরাত: তাৎপর্য, করণীয় ও বর্জনীয়

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

মাওলানা আব্দুল্লাহ বুলবুল

শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে ‘শবেবরাত’ বা ‘লায়লাতুল বারাআত’ বলা হয়। বাংলাদেশ ভারতসহ কাছাকাছি দেশগুলিতে ব্যাপকভাবে পালিত হয় শবেবরাত। শবেবরাত শব্দটি ফারসী। যার অর্থ হল অংশ বা নির্দেশ পাওয়ার রাত্রি। শবে বরাত সম্পর্কে কুরআনের সূরা দুখানের একটি আয়াতকে দলিল হিসেবে পেশ করা হলেও তা মূলত শবে কদরকেই ইঙিত করে। যেমন আয়াতে আছে-

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ

‘আমি একে (কুরআন) নাযিল করেছি। এক বরকতময় রাতে, নিশ্চয় আমি সতর্ককারী।’

এই আয়াতের লাইলাতুল মোবারাকা বলতে অনেকে শবে বরাতকে ধরে থাকেন যা নিতান্তই নির্বুদ্ধিতা । সূরা দুখানে উল্লিখিত ‘মুবারাক রজনী’ বলতে “শবে বরাত” বুঝানো হয় নি, বরং “শবে কদর” বুঝানো হয়েছে। সুরা কদরে স্পষ্টই উল্লেখ আছে কুরআন কদরের রাত্রিতে নাযিল হয়েছে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের সমন্বিত অর্থ ও সাহাবী-তাবিয়গণের ব্যাখ্যার আলোকে এ কথা নিশ্চিত যে, মুবারক রজনী বলতে লাইলাতুল কাদর বুঝানো হয়েছে। কাজেই সূরা দুখানের আয়াতগুলি মধ্য-শাবানের রজনীর জন্য প্রযোজ্য নয়।

শবে বরাত প্রসঙ্গে ১ম হাদীস:

‘শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনে রোজা রাখ। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহতায়ালা প্রথম আসমানে এসে বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোনো রিজিকপ্রার্থী? আমি তাকে রিজিক দিবো। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদের ডাকতে থাকেন।’ (ইবনে মাজাহ: ১৩৮৪)

কিন্তু হাদীস বিশারদ ইমামগণের মতানুযায়ী এই হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং বানোয়াট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ-

১. একমাত্র ইবনু আবি সাবরাহ ছাড়া এই হাদীসের আর কোনো রাবি পাওয়া যায়নি।

২. অনেক হাদিস বিশারদের মতে উক্ত রাবি বর্ণনাকারী হিসেবে অত্যন্ত দুর্বল।

৩. আল্লাহ তায়ালা শুধু মধ্য শাবানেই শেষ আসমানে নেমে আসেন না বরং সারা বছর প্রতিটি রাতের শেষভাগে তিনি শেষ আসমানে নেমে আসেন এবং মানুষকে ক্ষমার জন্য ডাকেন। মূলত অবতীর্ণ হওয়া ও ক্ষমা চাওয়ার আহবান প্রতি রাতেই আল্লাহ তা’আলা করে থাকেন। যা সুনির্দিষ্ট কোন রাত বা রাতসমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। হাদীস-

وَعَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللّهِ ﷺ: يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقى ثُلُثُ اللَّيْلِ الْاخِرِ يَقُولُ: مَنْ يَدْعُونِىْ فَأَسْتَجِيبَ لَه؟ مَنْ يَسْأَلُنِىْ فَأُعْطِيَه؟ مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَه؟. (مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ) وَفِي رِوَايَةٍ لِمُسْلِمٍ: ثُمَّ يَبْسُطُ يَدَيْهِ وَيَقُولُ: مَنْ يُقْرِضُ غَيْرَ عَدُومٍ وَلَا ظَلُومٍ؟ حَتّى يَنْفَجِرَ الْفجْرُ

আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনঃ প্রতি রাত্রে শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বারাকাতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার নিকট কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার নিকট মাফ চাইবে আমি তাকে মাফ করে দেব।’

মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে, তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, কে আছে যে এমন লোককে করয দেবে যিনি ফকীর নন, না অত্যাচারী এবং সকাল পর্যন্ত এ কথা বলতে থাকেন।

(বুখারী ১১৪৫, মুসলিম ৭৫৮। পরিচ্ছদঃ ৩৩. প্রথম অনুচ্ছেদ – ক্বিয়ামুল লায়ল-এর প্রতি উৎসাহ দান)

শবে বরাত প্রসঙ্গে ২য় হাদীস:

“পাঁচ রাতের দোয়া বিফল হয়না। রজব মাসের প্রথম রাত, মধ্য শাবানের রাত, জুমআর রাত, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার রাত।”

এই হাদীসটির রাবিকে ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ুতী দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন। অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও হাদীস বিশারদ এই হাদীসের একজন রাবি ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনু আবি ইয়াহইয়াকে মিথ্যাবাদি ও পরিত্যাক্ত ঘোষণা করেছেন।

শবে বরাত প্রসঙ্গে ৩য় হাদীস:

“মহান আল্লাহ্ চার রাতে হায়াত, মওত ও রিয্ক লিপিবদ্ধ করেন। মধ্য শাবান, ঈদুল আযহা, ঈদুল ফিতর ও আরাফার রাতে।”

এ হাদীসটি ইবনু হাজার আসক্বালানী (৮৫৫ হি) তাঁর যয়ীফ ও মিথ্যাবাদী রাবীদের জীবনীগ্রন্থ ‘লিসানুল মীযান’-এ উল্লেখ করেছেন।

অতএব এটিও দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য।

এছাড়াও রাসূলুল্লাহ (সা:) এরশাদ করেন,  كَتَبَ اللهُ مَقَادِيْرَ الخَلاَئِقِ قَبْلَ أنْ يَّخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَ الْأرْضَ بِخَمْسِيْنَ أَلْفَ سَنَةٍ.. ‘আসমান সমূহ ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাযার বৎসর পূর্বেই আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় মাখলূক্বাতের তাক্বদীর লিখে রেখেছেন’ (মুসলিম হা/৬৬৯০)।

শবে বরাত প্রসঙ্গে ৪র্থ হাদীস:

“মহান আল্লাহ্ মধ্য-শাবানের রাতে দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। অতপর কালব সম্প্রদায়ের মেষপালের সমান সংখ্যক অথবা মেষপালের পশমের সমান সংখ্যক লোককে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্ত করেন এবং বছরের রিযিক নির্ধারণ করেন ও হাজীদের তালিকা লিপিবদ্ধ করেন। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী অথবা শিরকে জড়িত অথবা বিদ্বেষী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।”

এ হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল এবং বানোয়াট পর্যায়ের। একদল অত্যন্ত যয়ীফ ও পরিত্যক্ত রাবীর নামে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে। আব্বাদ বিন আব্দুর রহমান, তাঁর চাচা মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান ও তাঁর পিতা আব্দুর রহমান আল- আরজামী সকলেই অত্যন্ত দুর্বল ও পরিত্যক্ত রাবী বলে পরিচিত।

নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামায:

শবে বরাতের রাতে তাহাজ্জুদ নামাযের কথা কয়েকটি অত্যন্ত দুর্বল বা অগ্রহণযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হলেও নির্দিষ্ট রাকাত নির্দিষ্ট সূরা দিয়ে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নামায বা একশ রাকাত নামাযের কথা কোথাও পাওয়া যায়নি। (কুরআন সুন্নাহর আলোকে শবেবরাতের আমল: ড. খোন্দাকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর: পৃষ্ঠা ১৩-১৬)

হালুয়া-রুটি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, ঐদিন আল্লাহর নবী (সা:) এর দান্দান মুবারক ওহোদের যুদ্ধে শহীদ হয়েছিল। ব্যথার জন্য তিনি নরম খাদ্য হিসাবে হালুয়া-রুটি খেয়েছিলেন বা গরম রুটি দিয়ে সেঁক দিয়েছিলেন বিধায় আমাদেরও সেই ব্যথায় সমবেদনা প্রকাশ করার জন্য হালুয়া-রুটি খেতে হয়। অথচ ওহোদের যুদ্ধ হয়েছিল ৩য় হিজরীর শাওয়াল মাসের ১১ তারিখ শনিবার সকাল বেলায়। আর আমরা সমবেদনা জানাচ্ছি দু’মাস পূর্বে শা‘বানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্রে… এটা হাস্যকর! এছাড়া রুটিই আরবের প্রধান খাদ্য।

তবে মধ্য শাবানের রাতে মৃতদের জন্য দোয়া ইস্তেগফার ও ব্যক্তিগত ক্ষমা প্রার্থনার উৎসাহ প্রসঙ্গে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য একটি হাদীস রয়েছে-

“যখন মধ্য-শাবানের রাত আগমন করে তখন একজন আহ্বানকারী আহ্বান করতে থাকে, কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোন যাচনাকারী আছে কি? আমি তাকে দান করব। ব্যাভিচারিনী ও শিরকে জড়িত ব্যতীত যত লোক যা কিছু চাইবে সকলকেই তাদের প্রার্থনা পূরণ করে দেয়া হবে।”

ইমাম বায়হাকীর বর্ণিত এই হাদীসটি দুর্বল হলেও বাতিল পর্যায়ের নয়। (কুরআন সুন্নাহর আলোকে শবেবরাতের আমল: ড. খোন্দাকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর: পৃষ্ঠা ১৩-১৬)

শবে বরাতে করণীয়:

কুরআন সুন্নাহর আলোকে শক্তিশালীভাবে প্রমাণিত না হলেও ইবাদতে যেহেতু নিষেধাজ্ঞা নেই আমাদের উচিৎ বাড়াবাড়ি না করে এ রাত্রিতে ব্যক্তিগতভাবে কবর যিয়ারত করা বা মৃতদের জন্য দুআ করা, ব্যক্তিগতভাবে একাকী ইবাদত ও দোয়া মুনাজাতে রত থাকা যায়।

আর রোযা রাখার ক্ষেত্রে বক্তব্য হল – প্রতিমাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোযা রাখা সুন্নাহ। রাসূল সাঃ শাবানের ১-১৫ দিন রোযা রাখতেন। মোটকথা শাবান মাস পুরোটাই গুরুত্বপূর্ণ তাই শুধু একদিনকে গুরুত্ব না দিয়ে পুরো মাসকে কাজে লাগানো। সবচেয়ে বড় কথা হলো, মুমিন যদি একটু আগ্রহী হন তবে প্রতি রাতই তার জন্য শবে বরাত।

শবে বরাতে বর্জনীয়:

এ রাতে ফজিলত ও প্রথার নামে এমন কিছু করা হয় এমন কিছু ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করা হয় যা বর্জনীয়। যেমন-

১. এ দিনের সন্ধ্যায় গোসল করা।

২. হালুয়া রুটি বানানো, বিতরণ ও আপ্যায়ন করা।

৩. শুধু ১৫ শাবানের দিনে রোযা রাখা।

৪. রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট সুরা দিয়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাত নামায পড়া।

৫. অদ্ভুত পদ্ধতিতে একশত রাকাআত নামায আদায় করা।

৫.বাড়ি কবর ও মসজিদে আলোক সজ্জা করা, আতশবাজি ফুটানো।

৬. দলবেধে মসজিদে মসজিদে ঘুরে বেড়ানো।

৭. রাস্তায় মিছিল বের করা, অলি গলিতে হই-হল্লা করা।

৮. মাইকে কোরআন খতম শাবিনা খতম করা।

৯. মসজিদে সমবেত হয়ে জিকির, দরুদের মাহফিল করা।

৯. চাঁদাবাজি করে অনুষ্ঠান আয়োজন, মেলা বসানো।

১০.বাড়ির হাড়ি বাসন বদলানো।

১১. শবে বরাতকে শবেকদরের চেয়ে গুরুত্ব দেয়া।

১২. ভাগ্য রজনী বলে মসজিদে হুড়োহুড়ি করা, বাকি বছর নামায রোযা বাদ দেয়া।

১৩. মৃত ব্যক্তিদের রূহগুলি সব দুনিয়ায় নেমে আসে মনে করা।

হাদিসে বর্ণিত নফল ইবাদাতগুলো ছাড়া অন্য সব রসম-রেওয়াজ (রীতি) ও কুসংস্কার ছেড়ে দিয়ে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার তওফিক আল্লাহ সবাইকে দান করুন। আমিন।

মাওলানা আব্দুল্লাহ বুলবুল: লেখক ও গবেষক

Share.