শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেও কি প্রশ্নফাঁস বন্ধ হবে?

0
Want create site? Find Free WordPress Themes and plugins.

বহুদিন থেকে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগের দাবি উঠছে। ছাত্রলীগের সাবেক-বর্তমান অনেক নেতা, আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা পর্যন্ত পদত্যাগের দাবির যৌক্তিকতাকে ইঙ্গিত করে মাঝে মাঝেই মন্তব্য করছেন। ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া শিক্ষামন্ত্রীর খুব ‘প্রশংসা’ করেছেন! তবে খালেদা জিয়ার প্রশংসা যে সরকারের বিরুদ্ধে রাজনীতি থেকে প্রসূত, সেটা বলাই বাহুল্য। শিক্ষামন্ত্রী নিয়ে জনসাধারণের ভেতরে ক্ষোভের শেষ নেই। একসময়ের বামপন্থী রাজনীতিবিদ নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগের মধ্যেই অনেকে শিক্ষা ক্ষেত্রে নৈরাজ্যের অবসান খুঁজছেন। কিন্তু আমার মনে হয়, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলেই প্রশ্ন ফাঁস এবং অন্যান্য অরাজকতা বন্ধ হবে না। কারণ, প্রশ্ন ফাঁসকারীরা শুধু টাকার জন্য এই অপরাধ করছে বলে মনে হয় না। এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আছে এবং সে ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন শিক্ষামন্ত্রী।

২০০৯ সাল থেকে শুরু এখন পর্যন্ত টানা রাষ্ট্র পরিচালনা করছে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। গত নয় বছরে আওয়ামী লীগ সরকার তথা বাংলাদেশের প্রাপ্তি অনেক। তবে সমস্ত সাফল্যের পেছনে যদি কোনো একক মানুষের নাম নিতে হয়, তিনি নিঃসন্দেহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী একা যতটুকু পারছেন, সবক্ষেত্রে নজর রেখে বাংলাদেশকে এ পর্যন্ত টেনে এনেছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার যথাসাধ্য পরিচালনায় যোগ্য সাহচর্য দিয়েছেন এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তারা। তবে এই উন্নয়নের সুফল ভোগ করার হিসেব করলে দেখা যাবে, সামরিক-বেসামরিক আমলা শ্রেণি আর দুর্নীতি-পরায়ণ রাজনীতিবিদরা এগিয়ে আছেন। প্রবাসী শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিক, গ্রামবাংলার কৃষকসমাজের নিরলস পরিশ্রমে, প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সৎ নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রের নৈরাজ্য সমস্ত অর্জনকে পুরোপুরি ম্লান করে না দিলেও, বলা যায়, অনেকখানি ঢেকে দিচ্ছে।

সামনে নির্বাচন। মানুষ আলোচনা করবে আওয়ামী লীগের সরকারের সাফল্য নিয়ে। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে ফিরছে প্রশ্নফাঁসের লোমহর্ষক সব গল্প। এসএসসি, এএইচসি পরীক্ষার প্রশ্ন তো বটেই, প্রাইমারি স্কুলের পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যন্ত ফাঁস হয়ে যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, পরীক্ষার আগে সাইবার বাজারে চলে আসা প্রশ্ন এক শ্রেণির অপরাধপ্রবণ শিক্ষক, শিক্ষার্থী আর তাদের অভিভাবকরা মিলে সমাধান করছে। ইতোমধ্যে দুই/একজন শিক্ষক ধরাও পড়েছেন। মন্ত্রী কদিন আগে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। কিন্তু মন্ত্রী মহোদয় নিজেও মনে হয়, বুঝতে পারছেন না, প্রশ্ন ফাঁস করে টাকা কামানোর উদ্দেশ্য নেই প্রশ্নফাঁসকারীদের। প্রশ্নফাঁসকারীরা নিশ্চয় সরকারের সব অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায়। নির্বাচনকে সামনে রেখে মানুষের মন থেকে সরকারের সাফল্যগুলো মুছে দিতে চায়। প্রশ্নফাঁস সাধারণ কোনো অপরাধ নয়। জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চাচ্ছে বাংলাদেশ বিরোধী শক্তিরা।

শিক্ষা ক্ষেত্রে দারুণ এক সাফল্য দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল শেখ হাসিনার সরকার। নতুন বই বছরের প্রথম দিন ছাত্র-ছাত্রীদের হাতে তুলে দেয়ার মত বিরল ঘটনা ঘটিয়েছিল শেখ হাসিনা সরকার। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের এখানে বড় অবদান, এর জন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটতে থাকলে প্রতি বছর নতুন বই প্রথমদিন সরবরাহ করার মতো সাফল্য ম্লান হতে শুরু করে। দেশের গণমাধ্যমগুলো বারবার প্রমাণাদি দিয়ে রিপোর্ট করেছে। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্নফাঁসের ঘটনা দিনের পর দিন অস্বীকার করে গেছেন। আমলে নিতে চাননি। এখন পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করে কি তিনি প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে পারবেন? কারণ যারা প্রশ্ন ফাঁস করে ইতোমধ্যেই অনেক টাকার মালিক হয়ে গেছেন কিংবা যারা রাজনৈতিক কারণে প্রশ্নফাঁস করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পেরেছেন, তারা পাঁচ লাখ টাকার জন্য সেই পথ পরিহার করবে বলে মনে হয় না। আর অভিভাবক আর শিক্ষক, এমনকি শিক্ষার্থীদের একটা অংশ এখন নিজেরাই ভয়াবহ দুর্নীতি-পরায়ণ হয়ে উঠেছেন। এদের কাছ থেকে প্রতিরোধের আশা করা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু নয়। অনেক সৎ মানুষ আছেন, কিন্তু বিপদে পড়তে পারেন ভেবে এগিয়ে আসেন না।

দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যেটি অন্য যেকোনো দেশে হলে মন্ত্রী পদত্যাগ তো করতেনই, বরং তাঁদের জেল-জরিমানা হতে পারত। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন এমনই নাজুক হয়ে পড়েছে যে, পরীক্ষা না দিয়েই পাস করে যাচ্ছে ছেলে-মেয়েরা। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিইসি) পরীক্ষা না দিয়েই তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চার শিক্ষার্থী পাস করেছে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছিল। ৩ জানুয়ারি এ ঘটনা জানাজানি হয়।

ওই চার শিক্ষার্থী হলো-উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের পদুয়া দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী আয়শা আক্তার, একই স্কুলের নুসরাত জাহান, জগন্নাথ দীঘি ইউনিয়নের বেতিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র এবায়দুল হোসেন ও মুন্সিরহাট ইউনিয়নের মুন্সিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী মোসা. সাথি আক্তার। গত ৩০ ডিসেম্বর সারাদেশে একযোগে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। চৌদ্দগ্রাম উপজেলার বেতিয়ারা, মুন্সিরহাট ও পদুয়া দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই চার শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ না নিলেও ফলাফলে তাদের নাম এসেছে। পরীক্ষার ফলাফলে আয়শা আক্তার (রোল নম্বর- ৮১৮৯) পেয়েছে জিপিএ-২.৩৩ ও তার মোট নম্বর ২৯০। নুসরাত জাহান (রোল নম্বর- ৮১৯০) পেয়েছে জিপিএ-২.২৫, তার মোট নম্বর ২৯৩। এবায়দুল হোসেন (রোল নম্বর- ৭৬৮২) পেয়েছে জিপিএ-৩.৫৮, তার মোট নম্বর ৩৭৮ এবং সাথি আক্তার (রোল নম্বর- ৪৪৭০) পেয়েছে জিপিএ-২.৫০, তার মোট নম্বর ৩০৫।

কী ভয়ানক ঘটনা! পরীক্ষা না দিয়েই পাস করে ফেলেছে আমাদের ছেলে-মেয়েরা। বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছিলেন বেতিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হামিদা আক্তার ও মুন্সিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান।

দেশে একসময় বিতর্ক ছিল, উত্তরপত্র মূল্যায়ন নিয়ে। এ প্লাসের বাম্পার দেখে দেশের সচেতন মানুষেরা সমালোচনা করতে শুরু করলে, শিক্ষামন্ত্রণালয় কিছুটা বোধহয় আমলে নিতে শুরু করেছিলেন। গত কয়েক বছর এ প্লাসের বাম্পারে কিছুটা লাগাম টেনে ধরা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের ঘটনা এখন সব আতংককে ছাড়িয়ে চলে গেছে। শুধু পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন নয়, সরকারি-বেসরকারি খাতের নানা চাকুরির পরীক্ষা, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন পর্যন্ত ফাঁস হয়ে বাজারে চলে গিয়েছিল বলে আমরা সংবাদ প্রতিবেদন পড়েছি, শুনেছি।

সর্বশেষ চলমান এসএসসি পরীক্ষার একাধিক বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেছে, কিন্তু পরীক্ষা বাতিল হয়নি। প্রশ্নফাঁসকারীরা প্রকাশ্যে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রশ্ন ফাঁস করে দিচ্ছে। চলমান এসএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পত্রের পর ইংরজি প্রথম পত্রের প্রশ্নও ফাঁস হয়। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্নফাঁসের বিজ্ঞাপনও ফেসবুকে এসেছে। মন্ত্রী বাহাদুর কিন্তু কথা দিয়েছিলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা আবার ঘটলে পরীক্ষা বাতিল করে দেবেন। পরীক্ষা বাতিল মর্মে একটা কমিটি হয়েছে। যেখানে মিডিয়াতে প্রমাণসহ রিপোর্ট এসেছে, সেখানে তদন্ত কমিটি করে এত বিলম্ব করে সিদ্ধান্ত দিতে হবে কেন? তবে বাতিল করে কী হবে? কতগুলো বাতিল করবেন? প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে হবে। কীভাবে করবেন, সেটা নিশ্চয় জনগণের ভাবনার বিষয় নয়। এই দায়িত্ব পুরোপুরি মন্ত্রণালয়ের।

প্রশ্ন ফাঁসকারীকে ধরতে হলে জায়গামত ওষুধ দিতে হবে। ফেসবুক প্রশ্ন ফাঁস করছে না। মানুষ প্রশ্নফাঁস করে ফেসবুকে দিয়ে দিচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রীকে আমার অতি উঁচু মানের সরল মানুষ বলে মনে হয়। না হলে উনাকে ধুরন্ধর কর্মকর্তাগুলো কীভাবে বোঝাতে সক্ষম হল যে, কোচিং সেন্টার আর ফেসবুকই প্রশ্ন ফাঁস করছে? যারা প্রশ্ন প্রণয়ন করছে এবং প্রশ্ন হেফাজত করছে, যারা প্রশ্ন রিসিভ করছে এবং বণ্টন করছে এগুলোরে ধরে রিমান্ডে নিলেই তো প্রশ্নফাঁসের ঘটনা বের হয়ে যায়। এর আগে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের ছবিসহ গণমাধ্যমে লেখালেখি হয়েছে কিন্তু মন্ত্রী বাহাদুর কোনো একশন নেননি। আমার এক লেখায় আমি মোবাইল কোর্টের সাজেশন দিয়েছিলাম। পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে এবং পরীক্ষা কেন্দ্রের একটি নির্দিষ্ট এলাকার মধ্যে কোনো পরীক্ষার্থী বা তাদের বাবা-মা এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকগণ ব্যবহার করতে পারবে না, এমন নিয়ম করে বাস্তবায়ন করতে পারলে প্রশ্ন ফাঁস হবে না আমার বিশ্বাস। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করে কিছু হবে না। ফেসবুক বন্ধ হয়ে গেলে অনেক বিষয়ে ভালো মানুষেরা জনমত তৈরি করতে পারবে না।

মিডিয়া নিজের দায়িত্ব পালন করছে, নাগরিকরাও কম-বেশি করছে। কিন্তু মন্ত্রণালয় প্রশ্নফাঁস রোধে কার্যকর কিছু করতে পারছে না। এই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার জন্য সরকারের বাদবাকি সব অর্জন জনপরিসরে জায়গা করে নিতে পারছে না। শিক্ষা মন্ত্রী পদত্যাগ করবেন না; করলে আরও আগেই করা উচিত ছিল। পদত্যাগ করবেন দূরের কথা, প্রশ্নফাঁসের ঘটনা স্বীকারই করতে চান না তিনি। দেশের প্রায় সব বড় বড় ভালো কাজে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও দ্রুত কার্যকর কিছু করার জন্য দেশের মানুষ উনার দিকেই তাকিয়ে আছে। শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য বন্ধে যত দ্রুত ‘মানবতার জননী’ খ্যাত শেখ হাসিনা সঠিক পদক্ষেপ নিবেন, তত দ্রুত দল, সরকার তথা বাংলাদেশের মঙ্গল।

শেখ আদনান ফাহাদ

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এখানে মন্তব্য করুন
Did you find apk for android? You can find new Free Android Games and apps.
শেয়ার করতে আপনার একাউন্ট আইকণে ক্লিক করুন
  • 1.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
    1.8K
    Shares
Share.

About Author