বিশ্বে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করছে ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’
বিশ্বে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করছে ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’

বিশ্বে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করছে ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’

বিশ্বে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করছে ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড’। মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে, তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান এবং এ খাতের সাফল্যগুলো তুলে ধরতে প্রতি বছর ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের আয়োজন করা হয়। আন্তর্জাতিক এই মহাযজ্ঞে সারাবিশ্ব থেকে বিশেষজ্ঞ বক্তা, উদ্যোক্তা, প্রযুক্তির আদর্শ ব্যক্তিত্বরা সরাসরি বিভিন্ন পর্বে অংশ নেন।

এছাড়া এ আয়োজনে বিশ্বখ্যাত পণ্য নির্মাতা ও উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিয়ে তাদের আপডেট পণ্য ও সেবা প্রদর্শন করে। গত কয়েক বছর ধরে রাজধানীতে শীতের মৌসুম শুরুর প্রথমদিকেই এ আসর বসে। দেশের প্রযুক্তিপ্রেমীরাও রীতিমতো আসরের অপেক্ষায় থাকেন।

বিশ্বের প্রযুক্তিপ্রেমীদের কাছে জার্মানি সিবিট, সিঙ্গপুর কমিউনিক এশিয়া আর দুবাই জাইটেক্স মেলার জন্য বিখ্যাত। এরইমধ্যে বাংলাদেশ ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড –এর জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পেতে চলেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হচ্ছে। এটা ইতিবাচক দিক।

দেশে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড আয়োজিত হচ্ছে ২০১২ সাল থেকে। তার আগে এই প্রদর্শনী ছিল আইসিটি ওয়ার্ল্ড শিরোনামে। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড নামে শুরুর পরে প্রতি বছরই এই আয়োজনের জৌলুস বেড়েছে। ২০১৪ সালে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে ডিজিটাল গ্রাম, অগমেন্টেড রিয়েলিটি প্রযুক্তি, সোলার নৌকা-রিকশা ইত্যাদি প্রদর্শন করা হয়। এছাড়া ১০টি উদ্ভাবনী প্রকল্পে পৌনে দুই কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোক্তা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই আসর।  গত বছর দেশীয় নির্মাতাদের ডেভেলপ করা রোবট ধ্রুব’র অনুরোধে প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-এর উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

জানা গেছে, এবারের ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে আসছে আরও বড় চমক। মানবিক রোবট হিসেবে এরই মধ্যে খ্যাতি অর্জনকারী রোবট সোফিয়া আসছে। এই রোবট নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রযুক্তিপ্রেমীরা অপেক্ষায় আছেন রোবট সোফিয়াকে দেখতে।

প্রসঙ্গত, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহার করে জাতীয় লক্ষ্য অর্জন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন, অর্জিত সক্ষমতা প্রদর্শন এবং সংশ্লিষ্ট খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য ২০১১ সাল থেকে সরকারের আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিভাগের উদ্যোগে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশে কম্পিউটার মেলার ইতিহাস একেবারে নতুন নয়। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) শুরু করে এ আয়োজন। সেই অবস্থান থেকে আজকের এই ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড।

ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড থেকে প্রাপ্তির বিষয়ে ইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত সাড়ে আট বছর আগে আমরা যখন দায়িত্ব নিই তখন আমাদের সফটওয়্যার ও সেবাপণ্যের রফতানির পরিমাণ ছিল মাত্র ২৬ মিলিয়ন ডলার। সেই রফতানির পরিমাণ বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারে। ২০১৮ সালে যার টার্গেট এক বিলিয়ন ডলার। আর ২০২১ সাল নাগাদ আমাদের লক্ষ্য পাঁচ বিলিয়ন ডলার। এই ঊর্ধ্বমুখী রফতানি আয় এমনি এমনি হয়নি। প্রতি বছর ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড আয়োজনের ফলে বাংলাদেশের অবস্থান, অর্জন পৌঁছে গেছে বিশ্বব্যাপী। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে যেমন বিশেষজ্ঞ বক্তারা এসেছিলেন তেমনি এসেছিলেন শীর্ষ উদ্যোক্তা, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররাও। তারা ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড-এর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। এদেশের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বিজনেস ম্যাচমেকিংয়ে অংশ নিয়েছেন। অর্জনটা এসেছে সামগ্রীকভাবে।’

তিনি বলেন, ‘এই প্রদর্শনী দেশ-বিদেশে আলোচনার জন্ম দেয়। মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কারণ এশিয়ার মধ্যে এটা অনেক বড় একটা আয়োজন। ফলে এটার একটা ব্র্যান্ড ইমেজও তৈরি হয়েছে। ফলে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডকে কোনোভাবেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কাজ ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। এ ধরনের প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা সেটাও উপস্থাপন করছি। আগে কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় আছি সেটা পরিস্কারভাবে সবার সামনে উপস্থাপন করা সহজ হচ্ছে।’

এক প্রশ্নের জবাবে পলক বলেন, ‘আগামীতে কৃত্রিম বুদ্ধি, বিগ ডাটা, সাইবার সিকিউরিটি এজেন্ট ও ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) বিশ্ব মাতাবে। আমাদেরও সেইভাবে প্রস্তুত হতে হবে। এসবের ওপর দেশ থেকে চার হাজার বিশেষজ্ঞ তৈরি হবে। ফলে সামনে একটা সুদিন আসতে যাচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে। প্রতি বছর ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের আয়োজন করে আমরা কিভাবে, কতটুকু এগোচ্ছি তা তুলে ধরা সম্ভব হচ্ছে।’

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সফটওয়্যার রফতানির পালে হাওয়া লেগেছে। পরিসংখ্যানও তাই বলে। আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে সফটওয়্যার রফতানি হচ্ছে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলার। গত বছর যার পরিমাণ ছিল ৭০০ মিলিয়ন ডলার।’

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিস (বেসিস) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সফটওয়্যার রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল তিন কোটি ২৯ লাখ ডলার। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল তিন কোটি ৫৩ লাখ ডলার। ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে সফটওয়্যার রফতানি দাঁড়ায় সাড়ে চার কোটি ডলারে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সফটওয়্যার রফতানি থেকে আয় প্রথমবারের মতো ১০০ মিলিয়ন (১০ কোটি) ডলার অতিক্রম করে। ওই অর্থবছরে মোট রফতানির পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ডলার। এই আয় বেড়ে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১২ কোটি ৪৭ লাখ ২০ হাজার ডলার ও ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে প্রায় ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এই খাত থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ মিলিয়ন ডলার রফতানি আয় হয়।

বেসিস সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেসিস সদস্য ১৮৫টি প্রতিষ্ঠান ৬০০ মিলিয়ন ডলার আয় করে। এর সঙ্গে ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার ডেভেলপার ও কলসেন্টারগুলোর সেবা রফতানি আয় যোগ করলে তা ৭০০ মিলিয়নে গিয়ে দাঁড়ায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেদিন থেকে দেশে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের বিভিন্ন প্রদর্শনী, মেলা হচ্ছে মূলত তখন থেকেই সফটওয়্যার রফতানির পরিমাণ বেড়েছে। কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন, এসব প্রদর্শনী, মেলায় বিদেশি ক্রেতারা আসেন। তারা দেখে গিয়ে বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করে, সফটওয়্যার ও সেবাপণ্য ক্রয়ের অর্ডার দেন। এছাড়া দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আয় বেড়েছে বিপিও (বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং) খাতের কলসেন্টার, মেডিক্যাল স্ক্রাইব, ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংসহ সংশ্লিষ্ট খাত থেকে।

জানা গেছে, আগামী ৬-৯ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে চারদিনের এ আয়োজনের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবারের আয়োজনে চমক হিসেবে থাকছে রোবট সোফিয়া। সরকারের ৪০টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দফতরের পাশাপাশি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এই আয়োজনে অংশ নেবে। এতে ২৭টি সেমিনারের পাশাপাশি ৭টি প্রদর্শনী জোনও থাকবে। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে গেমিং, ইন্টারনেট ফর অল, সাইবার নিরাপত্তা, ইনোভেশন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ নিয়ে থাকছে নানা আয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তির এই সম্মেলনে ৫০ জন বিদেশি বক্তাসহ শতাধিক বক্তা উপস্থিত থাকবেন। এবারের আসরের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘রেডি ফর টুমরো’।

এখানে মন্তব্য করুন
শেয়ার করতে আপনার একাউন্ট আইকণে ক্লিক করুন

Check Also

‘ডাক টাকা’ উদ্বোধন করলেন জয়

‘ডাক টাকা’ উদ্বোধন করলেন জয়

বাংলাদেশ ডাক বিভাগের মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা ‘ডাক টাকা’ কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ …