4 মিনিট লাগবে পড়তে
4 মিনিট লাগবে পড়তে

কীভাবে এলো জন্মদিন পালনের রীতি

জন্মদিন, বেশিরভাগ মানুষের কাছে প্রতিবছর অনেক প্রতীক্ষার একটি দিন। পরিবার আর বন্ধুদের সাথে নিয়ে আনন্দে কাটানোর একটি উপলক্ষ জন্মদিন। জন্মদিন উপলক্ষে হরেক রকমের কেকের দেখাও মেলে আজকাল। অনেক জন্মদিনের অনুষ্ঠান তো বিয়ের অনুষ্ঠানের থেকেও ধুমধাম হতে দেখা যায়। কিন্তু জন্মদিনের আনন্দ কিংবা জন্মদিন পালন কি সবসময় এমনই ছিল? নাকি এটি আধুনিক পুঁজিবাদ সমাজের ব্যবসা করার আরেকটি কৌশল? জন্মদিন পালনের শুরুটাই বা হয়েছিল কবে থেকে? চলুন ধীরে ধীরে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা যাক।

লিখিতভাবে জন্মদিনের কথা প্রথম জানা যায় বাইবেলের জেনেসিস অধ্যায় থেকে। মিশরের ফারাওদের জন্মদিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন ছিল মিশরে। বাইবেলে জন্মদিনের কথা বলা থাকলেও সেটি জন্মের দিন নাকি সিংহাসনে বসার দিন সেটি নিয়ে ইজিপ্টোলজিস্টদের মাঝে বিতর্ক রয়েছে। প্রাচীন মিশরে ফারাওদেরকে ঈশ্বর মনে করা হতো আর সিংহাসনে বসার দিনটিকে মনে করা হতো তাদের মানুষ থেকে ঈশ্বরে রূপান্তরের দিন। তাই ঠিক কোন দিনটির কথা বলা হচ্ছে সেটি পরিষ্কার বোঝা না গেলেও ফারাও এর জন্মের দিন কিংবা ‘ঈশ্বরে রূপান্তরের দিনটিকে’ বেশ ধুমধামের সাথেই পালন করা হতো। বাইবেলে বর্ণিত এই ফারাও ছিলেন ইউসুফ (আ) এর সময়ের ফারাও, যে সময় ইউসুফকে (আ) যৌন নির্যাতনের মিথ্যা অভিযোগে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। বাইবেলের বর্ণনা থেকে জানা যায়,

“তৃতীয় দিনটি ছিল ফারাউনের জন্মদিন। ফেরাউন তার সব কর্মকর্তাদের জন্য ভোজের আয়োজন করেন। ফেরাউন তার মদ-পরিবেশক ও রুটি প্রস্তুতকারককে ক্ষমা করে দিলেন”। [ওল্ড টেস্টামেন্ট, জেনেসিসঃ ৪০-২০]

খুব সম্ভবত মিশরেই সূচনা হয়েছিল জন্মদিন পালনের; Source: Smash Cultural Maxism

সে সময়ে সাধারণ মানুষদের জন্মদিন পালনের কোনো তথ্য ধর্মীয় কিংবা সাধারণ ইতিহাসে পাওয়া যায় না। ইউরোপেও জন্মদিন পালন শুরু হয় গ্রীক দেবি আর্টেমিসের জন্মদিনে চাঁদ আকৃতির কেক উৎসর্গ করে। ঠিক কীভাবে জন্মদিনের প্রথা গ্রীসে গিয়েছে সেটা জানা না গেলেও ধারণা করা হয় মিশরীয়দের ফারাওয়ের জন্মদিন পালন করার রীতি অনুসরণ করে গ্রীকরা তাদের দেব-দেবীদের জন্মদিন পালন করা শুরু করে। চন্দ্রদেবী আর্টেমিসের জন্মদিনের কেকে মোমবাতি জ্বালিয়ে কেকটিকে উজ্জ্বল করার বুদ্ধিও গ্রীকদের মাথা থেকেই এসেছিল।

ভূমধ্যসাগরের বাইরে পারস্যে সাধারণ জনগনের জন্মদিনের কথা হেরোডোটাসের লেখা থেকে জানা যায়। ধনীরা তাদের জন্মদিনে বেশ বড়সড় ভুড়িভোজের আয়োজন করতো পারস্যে। প্রাচীন ভারত কিংবা চীনে সাধারণ জনগনের জন্মদিনে পালনের তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে হিন্দু দেবতা কৃষ্ণের জন্মদিন উপলক্ষ্যে জন্মাষ্টমী বেশ অনেক বছর ধরেই ভারতবর্ষে প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু ঘুরে ফিরে জন্মদিন সেসময় দেব-দেবী কিংবা রাজা-বাদশাহদের জন্মদিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল মূলত।

আর্টেমিসের ভাস্কর্য; Source: Ancient History Encyclopedia

ধর্মীয় বেড়াজালের বাইরে প্রথম জন্মদিনের কথা জানা যায় রোমে। রোমে সাধারণ জনগণ পরিবার ও বন্ধুদের জন্য জন্মদিনের পার্টি শুরু করে। এমনকি বিশেষ ক্ষমতাশালী ও সম্মানিত ব্যক্তিদের জন্মদিনে সরকারিভাবে ছুটিও চালু হয়। তবে জন্মদিন পালন শুধুমাত্র পুরুষদের জন্যই ছিল। নারীদের জন্মদিন পালনের কোনো রীতি তখনো চালু হয়নি। ৫০তম জন্মদিন পালনের জন্য ময়দা, মধু, জলপাই তেল ও বিশেষ পনির দিয়ে বিশেষ কেক বানানো হতো।

প্যাগান সমাজে জন্মদিন পালনের রীতি থাকলেও সেমেটিক সমাজে জন্মদিন মোটেও স্বাভাবিক নিয়ম ছিল না। বরং প্যাগানদের থেকে উৎপত্তি হবার কারণে ইহুদী ও খ্রিস্টানরা প্রথমদিকে জন্মদিন পালনকে শয়তানের রীতি হিসেবে মনে করতো। তবে খ্রিস্টানদের ধ্যানধারণা পাল্টাতে থাকে চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে। প্রথমদিকে কোনো নিয়ম না থাকলেও চতুর্থ শতাব্দীর পর থেকে ঈসা (আ) এর জন্মদিন পালন শুরু করে খ্রিস্টানরা। এর ফলে খ্রিস্টান চার্চগুলো জন্মদিন পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে থাকে। প্রথমদিকে ধর্মীয় চরিত্রগুলোর মাঝে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষেরাও কেউ কেউ জন্মদিন পালন শুরু করে। বর্তমানে ক্রিসমাস পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

ক্রিসমাসের সজ্জা; Source: Southern Living

ইউরোপীয়ানদের হাত ধরে তাদের মতো জন্মদিন পালন ছড়িয়ে পড়তে থাকে পুরো পৃথিবীতে। যেসব সমাজে জন্মদিন পালনে কোনো প্রথা ছিল না তারাও শুরু করে জন্মদিন পালন। তবে জন্মদিন দীর্ঘদিন শুধু ধনীরাই পালন করত। অষ্টাদশ শতাব্দীতে জার্মানিতে কেক ও মোমবাতি দিয়ে বাচ্চাদের জন্মদিন পালন শুরু হয়। বাচ্চাদের মোমবাতি দেয়া হতো তাদের যততম জন্মদিন ততোটির থেকে একটি বেশি। এই বেশি মোমবাতিটি দিয়ে তাদের আরো এক বছর আয়ুর আশা করা হতো। মোমবাতি নিভিয়ে জন্মদিন পালনের রীতিও সেসময় থেকেই চালু হয়। সাধারণ মানুষের মাঝে কেক কেটে জন্মদিন পালনের প্রথা শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের ফলে কেক তৈরির উপকরণগুলো সহজলভ্য হওয়াতে। আধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে স্বল্প সময়ে অনেকগুলো কেক বানানো সম্ভব হতো, দামও তুলনামূলক কম থাকতো। ফলে ধনীদের পাশাপাশি স্বল্প আয়ের মানুষেরাও তাদের জন্মদিন পালন শুরু করে।

শিল্পায়নের সাথে সাথে তৈরি হচ্ছে জটিল সব কেক; Source: Whipped Bakeshop

জন্মদিনের বিখ্যাত গান “হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ” আসলে প্যাটি হিল ও ম্যাড্রেড হিলের সুর করা “গুড মর্নিং টু অল” গানের সুর। ১৮৯৩ সালে সুর করার পর সুরটি আমেরিকায় বেশ জনপ্রিয় হয়। অনেক জন্মদিনের অনুষ্ঠানে এ সুরের সাথে “হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ” কথা জুড়ে দেন প্যাটি হিল। আর এভাবেই ভিন্ন একটি গানের সুর পুরো পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত হয়ে যায় জন্মদিনের গানের সাথে। মজার ব্যাপার, ২০১৫ সালের আগ পর্যন্ত “হ্যাপি বার্থ ডে টি ইউ” গানটি ছিল কপিরাইট করা! অর্থাৎ বাণিজ্যিকভাবে এ গানটি ব্যবহার করতে হলে আপনাকে অর্থ দিতে হতো! এ গানটি থেকে মিলিয়ন ডলার ব্যবসাও হয়ে গেছে। তবে ২০১৫ সালে আমেরিকার একজন বিচারক এ কপিরাইটটিকে অবৈধ ঘোষণা করলে কপিরাইটেড অধিকার উঠে যায় গানটি থেকে।

একসময় যে জন্মদিন ছিল শুধুমাত্র দেব-দেবীদের জন্য, সেই জন্মদিন আজ ধনী গরীব নির্বিশেষে সবাই পালন করে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোতে। আজকাল মানুষ ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্মদিনও বেশ ধুমধাম করে পালন করা হয়ে থাকে। জন্মদিন উপলক্ষ্যে শুধুমাত্র আমেরিকাতে গিফট কার্ড বিক্রি হয় প্রায় বিশ লক্ষ। বিভিন্ন দিবস কিংবা অন্যান্য কার্ডের থেকেও বেশি বিক্রি হয় জন্মদিনের কার্ড। জন্মদিনের কার্ড ব্যবসার বেশ ভালো একটি মাধ্যম হয় উঠেছে, কেননা সব কার্ডের মধ্যে ৫৮% কার্ডই হয় জন্মদিনের কার্ড।

বাজারে মেলে হরেক রকমের বার্থ ডে কার্ড; Source: Pinterest

জন্মদিন উপলক্ষ্যে বানানো সবচেয়ে বড় কেকটি অবশ্য কোনো মানুষের জন্য ছিল না, বরং ছিল আলবামার ফোর্ট পেইন শহরের ১০০তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে বানানো। ১,২৮,২৩৮ পাউন্ড ওজনের কেকটিকে হারানো যে মোটেও চাট্টিখানি কথা না সেটি না বললেও বোঝা যায়। বিশাল এ কেকের উপরে আইসিং ছিল প্রায় ১৬,২০৯ পাউন্ডের! জন্মদিন পার্টির কথা বলতে গেলে সবচেয়ে ব্যয়বহুল জন্মদিন ছিল ব্রুনাইয়ের সুলতানের জন্মদিন। ১৯৯৬ সালের ১৩ জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত এ পার্টির খরচ হয়েছিল ২ কোটি ৭০ লক্ষ ডলারেরও বেশি। মাইকেল জ্যাকসনের মতো তারকাও পারফর্ম করেছিলেন সেদিনের পার্টিতে।

শেষ করা যাক একটি মজার সমস্যা দিয়ে, যাকে বলা হয় বার্থ ডে প্যারাডক্স নামে। ধরুন, একটি ঘরে ২৩ জন মানুষ আছে যাদের কারো জন্মদিন ২৯ ফেব্রুয়ারিতে না। এখন যদি আপনাকে বলা হয় এদের মধ্যে দু’জনের জন্মদিন একই দিনে হবার সম্ভাবনা কতো, তাহলে উত্তর কত দিবেন? পরের লাইনটি পড়ার আগে একটু চিন্তা করেই নিন না।

Source: Odyssey

আপনার উত্তর কি ৫০% এর আশেপাশে হয়েছে? যদি হয়ে থাকে তাহলে একদম ঠিক! অবাক হচ্ছেন? হবারই কথা, কিন্তু গণিতের মারপ্যাঁচে সম্ভাবনা ৫০% এর কাছাকাছিই হয়। সহজ ভাষায় বলতে গেলে ২৩ জনের মধ্যে দু’জনের জন্মদিন একই দিনে হতে পারে ২৫৩ ভাবে। গাণিতিকভাবে হিসেব করতে গেলে একই দিনে জন্মদিন হবার সম্ভাবনা বের করার থেকে একই দিনে জন্মদিন না হবার সম্ভাবনা বের করা বেশি সহজ। যেহেতু হয় একই দিনে জন্মদিন হবে অথবা হবে না সেহেতু দু’টোর যোগফল হবে এক (সম্ভাবতার সূত্রানুযায়ী)। ধরা যাক, প্রথম ব্যক্তির সাথে দ্বিতীয় ব্যক্তির একই দিনে জন্মদিন পড়ে না। সেক্ষেত্রে না হবার সম্ভাবনা ৩৬৫/৩৬৫। এভাবে হিসেব করতে থাকলে ২৩ জনের ক্ষেত্রে একই দিনে না হবার সম্ভাবনা হবে ০.৪৯২৭। একই দিনে জন্মদিন না হবার সম্ভাবনা যখন পেয়েই গেলেন, বাকিটুকুর একটু মাথা খাঁটিয়ে নিজেই বের করে নিন না!

ফিচার ইমেজ- WujinSHike

এখানে মন্তব্য করুন
শেয়ার করতে আপনার একাউন্ট আইকণে ক্লিক করুন

Check Also

4 মিনিট লাগবে পড়তে

মানুষের মতন আচরণ করেছিল যেসব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

প্রযুক্তি বেশ মজার ব্যাপার। ধাতব কলকব্জা দিয়ে তৈরি যন্ত্রগুলো ঠিক সেভাবেই কাজ করবে যেভাবে আপনি …