বিশ্বজিৎ হত্যা: পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে
বিশ্বজিৎ হত্যা: পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে

বিশ্বজিৎ হত্যা: পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর্যবেক্ষণে যা বলা হয়েছে

বিশ্বজিৎ হত্যা মামলাবহুল আলোচিত দর্জি দোকানদার বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখে হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। ৮০ পৃষ্ঠার এই রায়ে কী কারণে নিম্ন আদালতের সাজা পুরোপুরি বহাল রাখা যায়নি, তার পূর্ণ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে।

বিশ্বজিৎ হত্যার পর থানায় অপমৃত্যুর মামলা করা, লাশ দ্রুত গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া, ঘটনার পরপরই আসামিদের গ্রেফতার না করা, উদ্দেশ্যমূলক সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করার ঘটনায় আদালত পূর্ণাঙ্গ রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

মঙ্গলবার (৩১ অক্টোবর) রায় প্রদানকারী বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী পূর্ণাঙ্গ রায় লেখা শেষ করে রায়ে স্বাক্ষর করেন। বুধবার (১ নভেম্বর ) রায়ের একটি কপি সাংবাদিকদের হাতে আসে।

আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় অস্বচ্ছ তদন্ত কার্যক্রম প্রতিরোধ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে বিত্তশালী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে দায়মুক্তি উপভোগ করে। অপরাধ সংঘটনের পরও প্রভাব খাটিয়ে খুব সহজেই তদন্ত প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে যায়। এমন অনেক মামলা আছে যেখানে পুলিশ এবং অপরাপর তদন্ত সংস্থা, চিকিৎসক, বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক প্রতিবেদন দিয়ে অপরাধীকে সাহায্য করেছে।

রায়ে বলা হয়, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে অথবা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য অথবা অন্য কোনও উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য বেআইনিভাবে তারা এটা করে থাকে। এভাবে অসৎ ও উদ্দেশ্যমূলক তদন্ত অব্যাহত রাখতে পারি না। প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারীকে অবশ্যই দায়িত্বশীল হতে হবে এবং জবাবদিহিতা করতে হবে বলেও আদালত উল্লেখ করেন।

রায়ে বলা হয়, এই ভূমিতে গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির নামে কেউ কেউ আজ অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তাদের কারণে ছাত্র রাজনীতি মারাত্মকভাবে কলঙ্কিত হচ্ছে। কোনও কোনও সময় তারা নিজেদের এলাকায় নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তারের জন্য ন্যাক্কারজনকভাবে ক্ষমতা ও পেশীশক্তি প্রদর্শন করছে। তথাকথিত কিছু রাজনৈতিক নেতা তাদের নিজেদের স্বার্থে এদের পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে বলেও আদালত মনে করেন।

আদালত বলেন, আমরা সংবাদ মাধ্যমে আরও দেখেছি— পরীক্ষায় নকল করতে না দেওয়ায় শিক্ষককে পেটানো হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনের আবাসিক ভবনে প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে এবং সাধারণ ছাত্রদের ভাড়ার ভিত্তিতে সিট বণ্টন করেছে। তাদের মিছিল-মিটিংয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যেতে বাধ্য করেছে। বিষয়গুলো খুবই উদ্বেগজনক এবং হতাশাজনক। জাতি এর থেকে উত্তরণ চায়। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলীয় দায়িত্বশীল জাতীয় নেতাদের কাছে প্রত্যাশা— ছাত্র রাজনীতির এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য তারা নীতি নির্ধারণ করবেন।

রায়ে বলা হয়, আমাদের কাছে রেকর্ড অনুযায়ী চার জন ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নিজেদের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের জবানবন্দিতে উঠে আসা অভিযুক্তদের মধ্যে কেবল শাকিল চাপাতি দিয়ে ও রাজন কিরিচ দিয়ে আঘাত করেছে বিশ্বজিৎকে। মিটফোর্ড হাসপাতালে উপুর হয়ে পড়ে থাকা বিশ্বজিতের শরীরে দু’টি আঘাতের চিহ্ন দেখেছেন নিহতের বড় ভাই উত্তম কুমার দাস, যা অপরাপর সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত। মূলত এ ঘটনার সঙ্গে শাকিল ও রাজন দায়ী। তারা দু’জনই অস্ত্র দিয়ে মারাত্মক আঘাত করেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যার করার ঘটনাটি ছিল জঘন্য বর্বরতা। তাদের এই অপরাধ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও গোটা যুবসমাজের সঙ্গে মানানসই নয়। এ কারণে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম সহানুভূতি দেখাতে পারি না।

গত ১৬ মে থেকে বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি শুরু হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নজিবুর রহমান, মো. মনিরুজ্জামান রুবেল। আসামিদের পক্ষে আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট শাহ আলম শুনানি করেন।

এর আগে, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজিৎ দাস হত্যামামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের করা আপিল অগ্রাধিকারভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেন প্রধান বিচারপতি।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর নিরীহ পথচারী বিশ্বজিৎ দাসকে বাহাদুর শাহ পার্কের কাছে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর রায় দেন ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪। ২১ আসামির মধ্যে আট জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় ওই রায়ে।

পরে উচ্চ আদালত গত ৬ আগস্ট আলোচিত এ মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আট আাসামির মধ্যে দু’জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়, চার জনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং দু’জনকে খালাস দেওয়া হয়। এছাড়া, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আপিলকারী দুই আসামিকেও খালাস দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার প্রায় তিন মাস পর ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত হলো পূর্ণাঙ্গ রায়।

এখানে মন্তব্য করুন
শেয়ার করতে আপনার একাউন্ট আইকণে ক্লিক করুন

Check Also

মহানবীকে (সাঃ) কে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি, আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিল টিটু রায়

মহানবীকে (সাঃ) কে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি, আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিল টিটু রায়

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি ও অবমাননাকর ছবি পোস্ট করার অভিযোগে তথ্য …